বৈশাখী রঙ্গ

এম আব্দুল হালীম বাচ্চু

সাহিত্য

গ্রামের নাম লক্ষ্মীপুর। বছর ঘুরে সেই গ্রামে আবার এলো পহেলা বৈশাখ, আর সেই সঙ্গে জমে উঠল বৈশাখী মেলার আয়োজন। কিন্তু

2026-04-18T02:30:34+00:00
2026-04-18T02:30:42+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
বৈশাখী রঙ্গ
এম আব্দুল হালীম বাচ্চু
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ২:৩০ এএম  আপডেট: ১৮.০৪.২০২৬ ২:৩০ এএম
প্রতীকী ছবি
গ্রামের নাম লক্ষ্মীপুর। বছর ঘুরে সেই গ্রামে আবার এলো পহেলা বৈশাখ, আর সেই সঙ্গে জমে উঠল বৈশাখী মেলার আয়োজন। কিন্তু এই গ্রামের বৈশাখ মানেই শুধু পান্তা-ইলিশ নয়- এখানে থাকে একটু ‘রঙ্গ’, একটু ‘ঢং’, আর অনেকখানি ‘ঢঙের ভান’।

মেলার প্রধান উদ্যোক্তা মোকছেদ চেয়ারম্যান। সারা বছর তাকে কেউ ঠিকমতো দেখে না, কিন্তু বৈশাখ এলেই তিনি হয়ে ওঠেন সংস্কৃতির মহাগুরু। হাতে লাল-সাদা গামছা, চোখে কালো সানগ্লাস, মঞ্চে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আমাদের সংস্কৃতি রক্ষা করতে হবে! আধুনিকতার নামে যা চলছে, তা চলবে না!’

কথাটা বলেই তিনি পাশের ছেলেটাকে ফিসফিস করে বললেন- ‘এই যে ডিজে সাউন্ডটা একটু জোরে দে তো, লোকে যেন বোঝে আমরা পিছিয়ে নেই!’ এদিকে মেলার মাঠের এক কোণে বসেছে ‘গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খাবার’ স্টল। সেখানে পান্তা-ইলিশের দাম শুনে লোকজনের মাথা ঘুরে যাচ্ছে। গ্রামের রহিম কাকা দাম জিগ্যেস করতেই দোকানদার বলল, ‘এক প্লেট মাত্র ৫০০ টাকা!’ রহিম কাকা চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘এই দামে তো আমি পুরো মাছ কিনে ফেলতে পারি!’

দোকানদার হেসে বলল, ‘এইটা কিন্তু “ঐতিহ্য”, কাকা! ঐতিহ্যের দাম একটু বেশিই হয়!’ মেলার আরেক আকর্ষণ- লোকসংগীতের আসর। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখা গেল, হারমোনিয়ামের পাশে বসে এক তরুণ গাইছে আধুনিক গান, মাঝেমধ্যে ইংরেজি শব্দ ঢুকিয়ে। পাশে বসা বৃদ্ধ শিল্পী কাশতে কাশতে বললেন, ‘এইটা কোন লোকগান?’ তরুণটি হাসিমুখে বলল, ‘আধুনিক লোকগান, চাচা! আপডেটেড ভার্সন!’

এদিকে গ্রামের স্কুলশিক্ষক হাবিব স্যার খুবই চিন্তিত। তিনি চেয়েছিলেন মেলায় শিশুদের জন্য বইমেলা থাকবে, কিন্তু জায়গা দেওয়া হয়েছে নাগরদোলা আর ফাস্টফুডের দোকানকে। তিনি চেয়ারম্যানকে বলতেই মোকছেদ চেয়ারম্যান বললেন, ‘স্যার, বই তো সারা বছরই থাকে, কিন্তু বার্গার-ফ্রাইয়ের এই স্বাদ তো শুধু বৈশাখেই!’
আরও পড়ুন

মেলার সবচেয়ে হাস্যকর ঘটনা ঘটল বিকালে। আয়োজন করা হয়েছে ‘গ্রামীণ খেলাধুলা প্রতিযোগিতা’ যার মধ্যে দড়ি টানাটানি, হাঁড়ি ভাঙা ইত্যাদি। কিন্তু অংশগ্রহণকারীদের বেশিরভাগই শহর থেকে আসা অতিথি, যারা এসব খেলার নামই ঠিকমতো জানে না। এক যুবক চোখ বেঁধে হাঁড়ি ভাঙতে গিয়ে হাঁড়ির বদলে পাশের চায়ের দোকানেই লাঠি চালিয়ে দিল! দোকানদার চিৎকার করে উঠল, ‘এই যে ভাই, বৈশাখ মানে আমার দোকান ভাঙা না!’

সন্ধ্যার পর শুরু হলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। মঞ্চে আবারও উঠলেন মোকছেদ চেয়ারম্যান! এবার তিনি নিজেই গান ধরলেন, ‘এসো হে বৈশাখ’ কিন্তু তার গলার এমন অবস্থা যে, দর্শকরা হাসি চেপে রাখতে পারল না। কেউ কেউ মোবাইল বের করে ভিডিও করতে লাগল। চেয়ারম্যান গান থামিয়ে বললেন, ‘হাসির কী আছে? শিল্প বুঝতে শেখেন!’

সব মিলিয়ে লক্ষ্মীপুর খেলার মাঠের বৈশাখী মেলা যেন এক অদ্ভুত আয়না- যেখানে সংস্কৃতি আর আধুনিকতা একে অপরকে ঠেলে জায়গা করে নিতে চায়, আর মাঝখানে পড়ে থাকে একটু ভণ্ডামি, একটু হাস্যরস।

রাত শেষে যখন মেলা গুটিয়ে গেল, তখন গ্রামের মানুষজন নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল, ‘বৈশাখ তো এলো, আনন্দও হলো, কিন্তু আসল জিনিসটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল!’ হয়তো সেই হারানো জিনিসটাই সত্যিকারের বৈশাখ, যা আর খুঁজে পাওয়া যায় না মাইকের আওয়াজে, কিংবা দামি পান্তার প্লেটে; বরং থাকে মানুষের সহজ হাসিতে, মাটির গন্ধে, আর আন্তরিকতার ছোট্ট ছোট্ট মুহূর্তে।

এএডি/


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: