ট্রলার-টানেলে ইয়াবার নতুন রুট

এনামুল হক নাবিদ আনোয়ারা (চট্টগ্রাম)

সারাদেশ

চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলা আনোয়ারা নিঃশব্দেই পরিণত হয়েছে ইয়াবা পাচারের নতুন ট্রানজিট করিডোরে। কক্সবাজার অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারির পর মিয়ানমার

2026-04-18T02:56:24+00:00
2026-04-18T02:56:24+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
ট্রলার-টানেলে ইয়াবার নতুন রুট
এনামুল হক নাবিদ আনোয়ারা (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬, ২:৫৬ এএম 
প্রতীকী ছবি
চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলা আনোয়ারা নিঃশব্দেই পরিণত হয়েছে ইয়াবা পাচারের নতুন ট্রানজিট করিডোরে। কক্সবাজার অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারির পর মিয়ানমার থেকে সাগরপথে আসা কোটি কোটি টাকার ইয়াবা এখন মাছ ধরার ট্রলার ও জেলেদের আড়ালে পৌঁছাচ্ছে আনোয়ারার উপকূলে। এ ক্ষেত্রে অনেকটা অবাধে ব্যবহার হচ্ছে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম ও একমাত্র সুড়ঙ্গপথ কর্ণফুলী টানেলও। এই রুটের নির্ধারিত একাধিক পয়েন্ট ব্যবহার করে এসব মাদক ছড়িয়ে পড়ছে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।
 
৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর মাদক নির্মূলে থমকে আছে পুলিশের অভিযান। মাদক নির্মূলে পুলিশের অভিযান উল্লেখযোগ্য না হলেও র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর একাধিক অভিযানে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে র‌্যাব ৩টি বড় ধরনের মাদক উদ্ধারের অভিযান পরিচালনা করে। গত বছরের ১৭ জুলাই রাত আনুমানিক সোয়া ১১টায় উপজেলার রায়পুরের দক্ষিণ পরুয়াপাড়ার আনোয়ার মাঝির বাড়ি থেকে এসব ইয়াবাসহ ওই নারীকে গ্রেফতার করা হয়। ওই নারীর থেকে এক লাখ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এসব ইয়াবার আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি টাকা বলে জানা গেছে। গ্রেফতার মনোয়ারা বেগম রায়পুর ইউনিয়নের দক্ষিণ পারুয়াপাড়া গ্রামের আনোয়ার মাঝির স্ত্রী। এর পর গত বছরের ২২ আগস্ট আনোয়ারার উপকূলীয় এলাকায় র‌্যাবের অভিযানে তিন কোটি টাকার বেশি মূল্যের ইয়াবা আটক করা হয়েছে।

মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান ও আনোয়ারায় মাদকের ট্রানজিটের বিষয়ে র‌্যাব-৭ সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এআরএম মোজাফফর হোসেন বলেন, আনোয়ারা মাদক নির্মূলে র‌্যাব খুবই তৎপর থাকে। বিশেষ করে সাগরপথে ইয়াবা খালাস হয়ে আনোয়ারার বিভিন্ন রোড ব্যবহার হয়। আমরা ইয়াবা নির্মূলে একদম কঠোর অবস্থানে আছি। এর মধ্যে আমাদের বড় বড় অভিযান ছিল। ফলে কারবারি গডফাদাররা অনেকটা এলাকা ছাড়া আছে। এদিকে মাদকদব্য অধিদফতর ও গোয়েন্দা বিভাগ বলছে, চিহ্নিত বেশ কয়েকটি রুট দিয়ে মাদকচক্র নিয়মিত চালান পাচার করছে।
আরও পড়ুন

সূত্র জানায়, কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির প্রায় ৩০টি সীমান্ত পথ দিয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ইয়াবার চালান ঢোকে। চট্টগ্রাম শহর হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব চালান পৌঁছে। এতদিন চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক ছিল প্রধান পথ কিন্তু এই সড়কে বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশির কারণে ভিন্ন পথ নেয় পাচারকারীরা। এখন পাচারের রুট হিসেবে বেশি উপকূলীয় উপজেলা আনোয়ারাকে বেছে নিয়েছে। প্রায়ই ধরা পড়ছে ছোট-বড় চালান। প্রতিবার ইয়াবা বহনকারী গ্রেফতার হলেও গডফাদাররা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যৌথবাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে সাময়িকভাবে মাদক পাচার কমে এলেও ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে পুরোনো মাদকচক্র। এর সঙ্গে রাজনৈতিক বিভিন্ন নেতারাও জড়িত।

ট্রলার-জেলেদের আড়ালে ইয়াবা বাণিজ্য : অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিয়ানমারের মাদক রাজধানী খ্যাত সান স্টেট থেকে ইয়াবার চালান আসছে তুয়াঙ্গী ও ইয়াঙ্গুন নদী হয়ে প্যাথেইন শহরে। সেখান থেকে প্যাথেইন নদী পার হয়ে ট্রলারযোগে এগুলো পৌঁছায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমানার কাছাকাছি সেন্টমার্টিন দ্বীপে। সেখানে বাংলাদেশি জেলেদের কাছে ইয়াবার প্যাকেট তুলে দেওয়া হয়। এরপর মাছ ধরার ট্রলারে সেগুলো চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন পয়েন্টে নিয়ে আসা হয়। আনোয়ারায় ব্যবহার হচ্ছে ১০টি পয়েন্ট। এসব পয়েন্ট ব্যবহার হয়ে পাচারের জন্য ব্যবহৃত পয়েন্ট চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- গহিরা ইউনিয়নের রায়পুর, প্যারাবন এলাকা ও পারকি সৈকত, বরুমচড়া ইউনিয়নের ভরাচর জুইদী ইউনিয়নের অন্তত তিনটি ট্রলার ঘাট। এই রুটগুলো ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও নজরদারির বাইরে থাকায় পাচারকারীদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও অভিযানে বাধা : পুলিশ ও র‌্যাব সূত্র জানায়, আওয়ামী সরকারের আমলে আনোয়ারায় কয়েক দফা অভিযান চালাতে গিয়ে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে। অভিযান শুরুর আগেই প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ফোন করে হুমকি দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বাধার মুখে একাধিকবার অভিযান স্থগিত করে ফিরে যেতে হয়েছে। ফলে এলাকাটি মাদক প্রবেশের ‘স্বর্গরাজ্যে’ পরিণত হয়েছে।

অভিযোগ আছে- আনোয়ারা উপজেলায় ইয়াবা পাচার রুট সক্রিয় রাখতে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করত সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের একান্ত ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস) সায়েম। আনোয়ারা-কর্ণফুলীতে আওয়ামী সরকারের আমলে জাবেদের পরেই ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ছিল এই এপিএস।

পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই সায়েম দীর্ঘদিন ধরে মাদক সিন্ডিকেটের ছায়া-নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল। সে শুধু প্রশাসনিক পদমর্যাদার সুবিধা নেয়নি বরং ইয়াবা পাচারকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে কামিয়েছে হাজার কোটি টাকার সম্পদ। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, অভিযানের সময় যেখানেই অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হতো, সেখানেই সায়েমের নাম করে একাধিকবার হুমকি আসত। এর ফলে বহু অভিযান বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সবশেষ আনোয়ারায় ইয়াবাসহ উপজেলা কৃষক দলের আহ্বায়ক সালাউদ্দীন সুমনকে আটক করে যৌথবাহিনী। গত ১০ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে উপজেলার বরুমছড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করেন যৌথবাহিনীর সদস্যরা।

গডফাদাররা অধরা, গ্রেফতার হচ্ছে শুধু বহনকারী :
গত দেড় বছরে আনোয়ারা ও কর্ণফুলীতে ইয়াবা বহনকারী হিসেবে অন্তত শতাধিক গ্রেফতার করা হলেও গডফাদাররা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) তালিকা অনুযায়ী, চট্টগ্রামে ৪২ জন গডফাদারসহ ৩৮৯ জন মাদক কারবারি রয়েছে। এই তালিকায় আনোয়ারা উপজেলায় সক্রিয় রয়েছে কমপক্ষে ১৫ জন চিহ্নিত মাদক কারবারি, যাদের কেউ কেউ টেকনাফ থেকেও পরিচালনা করছে পাচার কার্যক্রম। এদের মধ্যে আনোয়ারা উপজেলার এরফান, জালাল, আনোয়ার, ইউসুফ, তাহের, বাদশা, সেলিম, ইদ্রিস, নঈম, আক্কাস, কালা মনু, আবু সালাম, ফরিদ, বাবু, নাছির অন্যতম।

আনোয়ারা নাগরিক ফোরামের সভাপতি আশরাফ উদ্দীন চৌধুরী কুসুম বলেন, মাদক পাচার ও মাদকসেবীদের বিষয়ে পুলিশকে কঠোর হতে হবে। সচেতন জনগণকে এটা সামাজিকভাবে প্রতিহত করতে হবে। গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে। গডফাদাররা অধরা থাকায় আনোয়ারা উপকূল থেকে বিভিন্ন রোড হয়ে চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে ইয়াবা, আইসসহ বিভিন্ন মাদক। মিয়ানমার ও ভারত থেকে আসা এসব মাদক চট্টগ্রামের বন্দরনগরী হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের উত্তর-পূর্ব, মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলে।

এ বিষয়ে আনোয়ারা সার্কেলের এএসপি সোহানুর রহমান সোহাগ বলেন, মাদক ও ইয়াবা নির্মূলে পুলিশ বরাবরই কঠোর অবস্থানে থাকে। সব কাজের মধ্যে মাদক নিয়ে পুলিশের পরিকল্পিত কাজ থাকে। তবে দেশের পরিস্থিতি অনুযায়ী পুলিশের কিছু কাজ প্রধান্য দিতে হয়। এর মধ্যে ৫ আগস্টের পর নির্বাচন নিয়ে আমাদের বেশি গুরুত্ব দিতে হয়েছে। আমরা মাদক কারবারি ও গডফাদার- সবকিছু কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনব।

এএডি/


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: