একজন নেটিভ আমেরিকান বীর যোদ্ধা চাঁদের আলোয় ঘোড়ায় চড়ে চলছেন ধূসর প্রান্তরের বুক চিরে। হঠাৎ দৃশ্যপটে দ্রুত ভেসে উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের শোষণের শিকার হওয়া বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ছবি। শিকলবন্দি কৃষ্ণাঙ্গ থেকে শুরু করে ইরাকের কুখ্যাত আবু গারিব কারাগারের নির্যাতিত কারাবন্দি। এরপরই দেখা যায় ইরানি সেনারা একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্রের গায়ে সেঁটে দিচ্ছেন বিশেষ বার্তা। কোনোটিতে লেখা ‘নিগৃহীত কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য’, কোনোটিতে লেখা ‘হিরোশিমা ও নাগাসাকির মানুষের স্মরণে’।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এই ভিডিওটি কোনো সাধারণ কার্টুন নয়, বরং এটি তেহরানভিত্তিক একটি ‘প্রোপাগান্ডা’ গোষ্ঠীর তৈরি লেগো-স্টাইল অ্যানিমেশন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের চলমান ভূ-রাজনৈতিক লড়াইয়ের নতুন হাতিয়ার এখন এই পরিচিত প্লাস্টিক ব্লকের খেলনা চরিত্রগুলো।
‘এক্সপ্লোসিভ মিডিয়া’ নামের একটি ইরানি গ্রুপ গত ২৯ মার্চ এই ভিডিওটি প্রকাশ করে। লেগো ফিগার ব্যবহার করে তৈরি করা এই ভিডিওগুলোতে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর বিশাল মূর্তি ভেঙে পড়তে দেখা যায়। ভিডিওর শেষে বড় সাদা হরফে ফুটে ওঠে কড়া বার্তা— ‘সবার জন্য এক প্রতিশোধ’।
গ্রুপটি জানায়, তাদের এই সৃজনশীল কাজে ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী ১০ জন তরুণ কাজ করছেন। ভিডিওগুলোতে ট্রাম্পকে ‘লুজার’ হিসেবে ব্যঙ্গ করা হয় এবং তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কথা তুলে ধরে তাকে ইসরায়েলের স্বার্থরক্ষাকারী হিসেবে চিত্রিত করা হয়।
ইতিমধ্যেই গুগল মালিকানাধীন ইউটিউব ‘সহিংসতা প্রচারের’ অভিযোগে এক্সপ্লোসিভ মিডিয়ার অ্যাকাউন্টটি মুছে দিয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ গ্রুপটির প্রতিনিধি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি আল জাজিরাকে বলেন, পশ্চিমা বিশ্ব সবসময় সত্যকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করে। লেগো অ্যানিমেশন কীভাবে সহিংস হতে পারে? আমরা কেবল সত্য বলছি।
তাদের দাবি, তারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করে। তবে ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো তাদের কাছ থেকে কন্টেন্ট কিনে প্রচার করে থাকে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, লেগো-স্টাইল ব্যবহারের পেছনে রয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের কাছে এই খেলনা অতি পরিচিত। ফলে যখন এর মাধ্যমে মার্কিন রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ফাটল (যেমন: এপস্টাইন কেলেঙ্কারি বা মাগা মুভমেন্ট) নিয়ে বিদ্রূপ করা হয়, তখন তা সহজেই পশ্চিমা দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
ইসলামাবাদভিত্তিক আলোচক ফাসি জাকা বলেন, কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা মিডিয়া ইরানের বিরুদ্ধে যে বয়ান তৈরি করে রেখেছে, এই ছোট ছোট ভিডিওগুলো সেই দেয়াল ভেঙে দেওয়ার একটি বুদ্ধিদীপ্ত উপায়। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজস্ব আক্রমণাত্মক ভঙ্গি ব্যবহার করেই তাকে পাল্টা জবাব দেওয়া হচ্ছে এখানে।
নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি কাতার-এর অধ্যাপক মার্ক ওয়েন জোন্স মনে করেন, ইরান ভালো করেই জানে তারা সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারবে না। তাই তাদের বড় লক্ষ্য হলো জনমতকে নিজেদের পক্ষে আনা। বর্তমান যুগে এই ধরনের ‘ট্রোল প্রোপাগান্ডা’ বা ট্রাম্প-স্টাইল ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণা তথ্যযুদ্ধে জেতার মোক্ষম হাতিয়ার।
সময়ের আলো/ কহু