চট্টগ্রামে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় সংঘটিত ঐতিহাসিক অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনা ইংরেজ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল রাতের সেই অস্ত্রাগার দখলের মধ্য দিয়ে বিপ্লবীরা চট্টগ্রামকে চারদিনের জন্য স্বাধীন রেখেছিলেন। ‘অস্ত্রাগার লুণ্ঠন দিবস’ হিসেবে পরিচিত হলেও পরবর্তীতে ‘লুট’ শব্দটির প্রতি আপত্তি জানায় ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশন। বর্তমানে দিনটি ‘চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ দিবস’ হিসেবে স্বীকৃত। আজ সেই ঐতিহাসিক দিন।
আজ থেকে ৯৫ বছর আগে দামপাড়া পুলিশ লাইনে এই বীরত্বগাঁথা ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নানা বই ও স্মৃতিকথায় বাঙালির গৌরবের সঙ্গে উঠে এসেছে এ ঘটনার বর্ণনা। দামপাড়ার উঁচু পাহাড়ের ওপর গাছপালায় ঘেরা ছোট লাল দালানটি ছিল সেই অস্ত্রাগার। ইটের তৈরি একতলা চারকোণা ভবনটি এখনও প্রায় আগের মতোই রয়েছে।
দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার পর ২০২১ সালে ভবনটির রঙ ও আদল অক্ষুণ্ণ রেখে এটিকে জাদুঘরে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয় সরকার। ভবনের সামনে সূর্য সেন ও প্রীতিলতার ছবি সংবলিত একটি নামফলক স্থাপন করা হয়, যেখানে অস্ত্রাগার দখলের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়। জাদুঘরে বিপ্লবীদের ছবি ও ব্যবহার্য সামগ্রীর প্রতিরূপ রাখা হয়। পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দামপাড়া পুলিশ লাইনে পাকবাহিনীর হাতে শহীদ পুলিশ সদস্যদের স্মারকও সংরক্ষিত হয়। অর্থাৎ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মুক্তিসংগ্রামকে একীভূতভাবে উপস্থাপন করা হয় সেখানে।
২০২২ সালের ২৬ মার্চ ‘পুলিশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, চট্টগ্রাম’ নামে জাদুঘরটি উদ্বোধন করা হয়। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে জাদুঘরটি বন্ধ হয়ে যায়।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানান, এ বিষয়ে তার কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে জাদুঘরে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীদের স্মৃতিচিহ্ন এবং পুলিশের আত্মদানের স্মারক রয়েছে বলে তিনি অবগত।
পরে সিএমপির জনসংযোগ শাখার সহকারী কমিশনার আমিনুর রশিদ বলেন, ২০২৪ সালে জাদুঘরটি আক্রান্ত হয়েছিল। বর্তমানে পুনর্নির্মাণ কাজ চলছে। তাই আপাতত বন্ধ রয়েছে।
১৮ এপ্রিল ১৯৩০: ঘটনাপ্রবাহ
১৯৩০ সালে দামপাড়ায় ইংরেজ পুলিশের রিজার্ভ ফোর্সের ব্যারাক ছিল। ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এ ভবনে অস্ত্র সংরক্ষণ করা হতো। এতে দুই পাশে লোহার রডযুক্ত কাঠের কারুকাজ করা জানালা ছিল। দেয়ালের পুরুত্ব ছিল ২০ ইঞ্চি, ছয়টি ইটের পিলারের ওপর দাঁড়ানো ভবনটির আয়তন ১৪০ বর্গফুট এবং উচ্চতা ১৪ ফুট। ভেতরের ছাদ ছিল বাঁকানো গম্বুজ আকৃতির।
বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম’ এবং অনন্ত সিংহের ‘চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ’ বইয়ে ঘটনাটির বিশদ বিবরণ রয়েছে। একই দিনে বিপ্লবীরা চট্টগ্রাম টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ অফিসেও আক্রমণ করেন। তখন দামপাড়া এলাকা জঙ্গলে ঘেরা ছিল এবং পুলিশ লাইনের পাহাড়টি বর্তমানের তুলনায় অনেক উঁচু ছিল।
পূর্ণেন্দু দস্তিদার তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন, রিজার্ভ ফোর্সের সদস্যরা এ দেশের সন্তান হওয়ায় সর্বাধিনায়ক মাস্টারদা সূর্যসেন তাদের বিভ্রান্ত করার কৌশল নেন। বিপ্লবীরা রাতে পাহাড় বেয়ে উঠতে উঠতে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ এবং ‘গান্ধীরাজ হো গিয়া, ভাগো’ স্লোগান দিতে থাকেন এবং আকাশে ফাঁকা গুলি ছোড়েন। এতে বিভ্রান্ত হয়ে অধিকাংশ রিজার্ভ ফোর্স সদস্য পালিয়ে যান।
উপরে উঠে প্রহরারত সান্ত্রি ও হাবিলদার বিপ্লবী গণেশ ঘোষ ও অনন্ত সিংকে নিজেদের কর্মকর্তা ভেবে সালাম দেন। তখন তাদের গুলিতে সান্ত্রি নিহত হলে আর কোনো প্রতিরোধ দেখা যায়নি। রাইফেল, গুলি ও অস্ত্রাগার ফেলে ইংরেজ সরকারের বেতনভুক্ত সদস্যরা পালিয়ে যায়।
পরে এ স্থানে সূর্যসেনের প্রধান দপ্তর স্থাপন করা হয়। গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিংহসহ বিপ্লবীরা সেখানে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেন। আনন্দ প্রসাদ গুপ্তের ‘চট্টগ্রাম বিদ্রোহের কাহিনী-বিপ্লবীদের কথা’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, পুলিশ লাইনের চারপাশে পাহারা বসিয়ে এটিকে ভারতীয় রিপাবলিকান ফৌজের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়। সূর্যসেনকে অস্থায়ী সরকারের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করা হয়, যা ভারতের বুকে প্রথম স্বাধীন অস্থায়ী সরকারের ঘোষণার ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত।
এ গ্রন্থে আরও বলা হয়, পুলিশ লাইন দখল করা কঠিন মনে হলেও তা সহজেই সম্পন্ন হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিরোধ আসেনি; তারা পালিয়ে যায়। পরে দুই পলাতক পুলিশ ফিরে এলে তাদের গ্রেপ্তার করে হাতকড়া পরিয়ে একটি কক্ষে বন্দী রাখা হয়।
দামপাড়া দখলের পর ইংরেজ বাহিনী পুনরায় ফিরে আসার চেষ্টা করে। ১৯ এপ্রিল ভোরের আগেই বিপ্লবীরা এলাকা ত্যাগ করে পাহাড়-জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। ২০ এপ্রিল তারা প্রায় অনাহারে দিন কাটায়। পরবর্তীতে তারা জালালাবাদ পাহাড়ে অবস্থান নেয়। ২২ এপ্রিল বিকেলে ব্রিটিশ বাহিনী সেখানে আক্রমণ চালায়। সরাসরি আক্রমণে ব্যর্থ হয়ে তারা পাশের উঁচু পাহাড়ে অবস্থান নিয়ে মেশিনগান দিয়ে গুলি চালায়। এতে ১০ জন বিপ্লবী নিহত হন। পরে বিপ্লবীরা পিছু হটলে ব্রিটিশ বাহিনী পুনরায় চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
জাদুঘরের সংগ্রহ
জাদুঘরে সূর্যসেন, প্রীতিলতাসহ বিপ্লবীদের পরিচিতি, ছবি ও ব্যবহৃত সামগ্রীর প্রতিরূপ রাখা ছিল। প্রীতিলতার ব্যবহৃত অস্ত্রের একটি প্রতিলিপিও সংরক্ষিত ছিল সেখানে।
একই স্থানে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও সংরক্ষিত হয়। ২৮ মার্চ ভোরে দামপাড়া পুলিশ লাইনে পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে এসপি শামসুল হক, ওসি আবদুল খালেকসহ ৫১ জন পুলিশ সদস্য শহীদ হন। বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে মোট ৮২ জন পুলিশ সদস্য শহীদ হওয়ার তথ্য রয়েছে। জাদুঘরে এসব ঘটনার স্মারক, ছবি এবং পুলিশের পোশাকের বিবর্তনও তুলে ধরা হয়।
বিপ্লবী তারেকশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সিঞ্চন ভৌমিক বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে বিপ্লবীদের বীরত্বগাঁথা তুলে ধরতে জাদুঘরটি পুনরায় চালু করা প্রয়োজন।