আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতির পর সোমালিল্যান্ডে কূটনৈতিক প্রতিনিধি নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। এর প্রেক্ষিতে পাকিস্তানসহ আরও ১১টি দেশ ইসরায়েলের এ পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা একে সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
এর আগে, বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ইসরায়েল ‘হর্ন অব আফ্রিকায়’ অবস্থিত এই স্বঘোষিত অঞ্চলটিকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মেনে নেয়।
সোমালিল্যান্ড কোথায়
সোমালিল্যান্ড সোমালিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত। এটি একসময় ব্রিটিশ সোমালিল্যান্ড নামে পরিচিত একটি উপনিবেশ ছিল। ১৯৬০ সালে স্বল্প সময়ের জন্য স্বাধীন হওয়ার পর এটি ইতালীয় সোমালিয়ার সঙ্গে একীভূত হয়ে বর্তমান সোমালিয়া রাষ্ট্র গঠন করে।
কিন্তু ১৯৯১ সালে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের পতন এবং গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সোমালিল্যান্ড একতরফাভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এরপর থেকে অঞ্চলটি নিজস্ব সংবিধান, নির্বাচিত সরকার, সংসদ, বিচারব্যবস্থা, মুদ্রা (সোমালিল্যান্ড শিলিং), পতাকা ও নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তোলে।
সোমালিয়ার সাবেক শাসক সিয়াদ বারে-এর শাসনামলে ১৯৮০–এর দশকে উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক দমন-পীড়ন চালানো হয়, বিশেষ করে হারগেইসা শহরে বোমাবর্ষণসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। এর ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার দাবি জোরদার হয়।
১৯৯০–এর দশকের শেষ দিক থেকে সোমালিল্যান্ড তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীলতা অর্জন করে এবং আফ্রিকার অনেক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের তুলনায় শান্তিপূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলে। নিয়মিত নির্বাচন, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর এবং স্থানীয় পর্যায়ে শাসনব্যবস্থা চালু থাকলেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না থাকায় এটি জাতিসংঘ বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে সরাসরি অংশ নিতে পারে না।
অন্যদিকে সোমালিয়া সরকার এখনো সোমালিল্যান্ডকে দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাবি করে এবং এটিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করে।
কেন ইসরায়েলের দূত নিয়োগে নিন্দা জানাচ্ছে বিভিন্ন দেশ
পাকিস্তানসহ আরও কয়েকটি দেশ ইসরায়েলের “তথাকথিত সোমালিল্যান্ডে” কূটনৈতিক প্রতিনিধি নিয়োগের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, এটি একটি স্বীকৃত রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
একটি যৌথ বিবৃতিতে সৌদি আরব, মিশর, তুরস্কসহ মুসলিম-প্রধান দেশগুলো সোমালিয়ার ঐক্য, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। তারা সতর্ক করে যে, এই ধরনের একতরফা পদক্ষেপ আঞ্চলিক সংঘাত বাড়াতে পারে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে উৎসাহিত করতে পারে।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারই একটি দেশের বৈধ প্রতিনিধি—এই ক্ষেত্রে তা হলো সোমালিয়া সরকার। তাই সোমালিল্যান্ডে দূত নিয়োগকে তারা “স্পষ্ট সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন” হিসেবে অভিহিত করেছে।
এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতিমালার পরিপন্থী বলেও সমালোচনা করা হচ্ছে। একইভাবে আফ্রিকান ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকায় উপনিবেশ-পরবর্তী সীমানা অক্ষুণ্ন রাখার নীতি অনুসরণ করে এবং একতরফা বিচ্ছিন্নতাকে নিরুৎসাহিত করে।
গাজা ইস্যু
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাটি শুধুমাত্র সোমালিল্যান্ডের স্বীকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে। এর আগে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আল-জাজিরার খবর আসে যে, গাজায় চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল পূর্ব আফ্রিকার কিছু অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, যেখানে সোমালিল্যান্ডের নামও উঠে আসে—ফিলিস্তিনিদের সম্ভাব্য পুনর্বাসন নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ জোর দিয়ে বলেছে, ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানচ্যুতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
/ইউএমএইচ