ইরানজুড়ে চলমান যুদ্ধ শুধু মানবিক বিপর্যয়ই ডেকে আনছে না; ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে এক গভীর পরিবেশগত সংকটের চিত্র। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, বিমান হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত এবং জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের ফলে দেশের আকাশ, মাটি ও পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে ভয়াবহ দূষণ।
ইরানের পরিবেশ দফতর সূত্রে জানা গেছে, তেহরানসহ একাধিক প্রদেশে তেল সংরক্ষণাগারে আগুন লেগে পুড়ে গেছে লাখ লাখ ঘনমিটার জ্বালানি। ফলে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড ও বিষাক্ত রাসায়নিক বাতাসে মিশেছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় এলাকা, জলাভূমি ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল যা জীববৈচিত্র্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই দূষণ শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতিই নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, কৃষি উৎপাদন ও নিরাপদ পানির প্রাপ্যতার ওপরেও গভীর প্রভাব ফেলবে। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের আড়ালে তৈরি হচ্ছে এক নীরব বিপর্যয় যার প্রভাব যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পরও টিকে থাকবে।
শিল্প থেকে জাদুঘর- কেবল ধ্বংস নয়, দূষণও বড় শত্রু : ইরানের পরিবেশ দফতরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল হামলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা উদ্বেগজনক। কমপক্ষে ১০টি প্রদেশে শিল্প, উৎপাদন ও সেবা খাতে হামলার ফলে ক্ষতির পরিমাণ ‘কম’ থেকে ‘অত্যন্ত গুরুতর’ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এগুলো হলো পূর্ব আজারবাইজান, আলবোরজ, বুশেহর, তেহরান, খোরাসান রাজাভি, খুজেস্তান, মার্কাজি, ইয়াজদ, গিলান ও ফার্স।
শুধু শিল্প নয়, পরিবেশ সংরক্ষণ কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত ২০টি জেলায়। একটি বিশেষ ঘটনায় আলবোরজ প্রদেশের কারাজ শহরের প্রাকৃতিক ইতিহাস ও জীববৈচিত্র্য জাদুঘর ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে। এ ছাড়া সাতটি প্রদেশের ১৩টি সংরক্ষিত এলাকা যার মধ্যে উপকূল, জলাভূমি ও বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রয়েছে সেগুলোও বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতির মুখে পড়েছে।
তেলের আগুন- বাতাসে বিষ, মাটিতে কালো বৃষ্টি : সবচেয়ে বড় পরিবেশ দূষণ এসেছে তেল সংরক্ষণাগারের আগুন থেকে। তেহরান প্রদেশের একাধিক তেল ডিপোতে আগুন লেগে পুড়ে গেছে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার ঘনমিটার জ্বালানি। এর ফলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় ১০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং প্রায় ৪ হাজার টন বিপজ্জনক উদ্বায়ী যৌগ। এ ছাড়া আলবোরজ প্রদেশে জ্বালানি ট্যাঙ্কে হামলার ফলে আরও ৫৩ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়েছে। এই দূষণ কেবল তাৎক্ষণিক নয় দীর্ঘমেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশে গভীর প্রভাব ফেলবে।
ইউরো নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের ফলে তৈরি হওয়া এই দূষণ কৃষি, পানীয় জল ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে। তেল স্থাপনায় আগুন, জাহাজ ও ট্যাঙ্কার ধ্বংস- সব মিলিয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বিষাক্ত রাসায়নিক ও ভারী ধাতু।
ইরানকে বহু বছর পিছিয়ে দেবে এই দূষণ : ইরানি বিজ্ঞানী ড. কাভেহ মাদানি জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক। তিনি ইউরো নিউজকে বলেন, এই পরিস্থিতি ইরানকে বহু বছর পিছিয়ে দেবে। তার মতে, এ মাত্রার দূষণ একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে প্রায় ধ্বংস করে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন, আকাশে ভাসমান সূক্ষ্ম কণাগুলো ফুসফুস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিষাক্ত রাসায়নিক দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কিছু এলাকায় ‘কালো বৃষ্টি’ও দেখা গেছে। যেখানে ধোঁয়া ও রাসায়নিক মিশে বৃষ্টির সঙ্গে মাটিতে পড়ছে। পানির ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বাড়ছে দ্রুত। উপসাগরীয় অঞ্চলে ডেস্যালাইনেশন প্ল্যান্টের ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। যুদ্ধের কারণে এসব প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা পানি দূষিত হলে সৃষ্টি হতে পারে ভয়াবহ বিশুদ্ধ পানির সংকট।
শুধু ইরান নয়, গোটা অঞ্চল ঝুঁকিতে : ‘এটলাস ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সে’ লেখা এক নিবন্ধে বিশ্লেষক ক্রিস্টোফার স্প্রেঙ্গার সতর্ক করে বলেছেন, ইরান সংঘাত কেবল সামরিক নয়, এটি একটি কাঠামোগত ঝুঁকির সংকেত। যদি কোণঠাসা পরিস্থিতিতে ইরান ‘ডিনায়াল স্ট্র্যাটেজি’ গ্রহণ করে, তা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। পারস্য উপসাগরের চারপাশে বিশ্বের সবচেয়ে ঘন তেল অবকাঠামো অবস্থিত। এতে বড় পরিসরে আগুন লাগলে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক পরিবেশেও প্রভাব ফেলবে।
১৯৯১ সালে কুয়েতে প্রায় ৭০০টি তেল কূপে আগুন লাগানোর উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, প্রতিদিন প্রায় ৪৬ লাখ ব্যারেল তেল পুড়েছিল, যা আকাশে বিপুল কালো ধোঁয়া ছড়িয়েছিল এবং সূর্যালোকের বড় অংশ আটকে দিয়েছিল। স্প্রেঙ্গার আরও সতর্ক করে বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় সেই মাত্রা আরও বড় হতে পারে। এর ফলে তাপমাত্রা হ্রাস, বৃষ্টিপাতের ধরণ বদলে যাওয়া এবং কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একটি ক্ষেপণাস্ত্রও ছাড়ে বিষাক্ত কার্বন : কলম্বিয়া ক্লাইমেট স্কুলের বিশ্লেষক দারিউশ নুরবাহা যুদ্ধের পরিবেশগত প্রভাবকে আরও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরেছেন। তার মতে, যুদ্ধ শুধু বিস্ফোরণ বা ধ্বংস নয় এটি এক ধরনের নীরব দূষণ, যা মানুষের শরীর ও পরিবেশে দীর্ঘদিন থেকে যায়। তার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে প্রায় শূন্য দশমিক এক চার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হতে পারে।
যদি প্রতিদিন হাজার হাজার হামলা হয়, তা হলে মাস শেষে এই নির্গমন দাঁড়ায় হাজার হাজার টনে। যুদ্ধ শেষ হলে যেমন মানুষ ফিরে তাকায় ধ্বংসস্তূপের দিকে ঠিক তেমনি যুদ্ধের প্রভাবে একদিন তাকাতে হবে বিষাক্ত বাতাস, দূষিত পানি ও মৃত মাটির দিকেও। কারণ সেই বিপর্যয় নীরব, কিন্তু চিরস্থায়ী।