চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে আমদানি-রফতানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রয়োজনীয় জ্বালানি (ডিজেল) সংকটের কারণে এই বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এই সংকটকে পুঁজি করে ট্রাক প্রতি ভাড়া বেড়েছে ৫/৬ হাজার টাকা। ফলে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা।
এদিকে সময়মতো প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল না পাওয়ার ফলে বন্দরে আগের তুলনায় পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাকের সংখ্যা কমেছে। যে কারণে ভাড়া বেশি দিলেও ট্রাকের ঘাটতি পূরণ হচ্ছে না। ফলে জ্বালানি তেলের এই অস্থিরতায় আমদানি করা কাঁচামাল সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না। যা সামগ্রিকভাবে বন্দরের রাজস্ব আদায়েও প্রভাব ফেলার আশঙ্কা তৈরি করেছে। সংগত কারণে আমদানি পণ্য পরিবহনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীরা।
ভোমরা স্থলবন্দরের আমদানিকারক রিপন হোসেন বলেন, দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রান্সপোর্টগুলো ঠিকমতো গাড়ি দিতে পারছে না। অল্প কিছু গাড়ি দেওয়া হলেও অনেক সময় সেগুলো মাঝপথে গিয়ে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। উত্তরবঙ্গের দিকে যতগুলো গাড়ি পাঠাচ্ছি, তার অর্ধেক পথেই গিয়ে তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। সাতক্ষীরা থেকে স্বল্প পরিমাণ তেল নিয়ে গাড়ি ছাড়লেও তা গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না।
ফলে মাল দেরিতে পৌঁছাচ্ছে এবং কাঁচামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মাল দেরিতে পৌঁছানোর কারণে অনেক পার্টি কেজিপ্রতি পাঁচ থেকে ছয় টাকা পর্যন্ত কেটে নিচ্ছে। এতে আমরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছি। জ্বালানি সংকট দ্রুত সমাধান না হলে আমাদের ব্যবসা চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
সাতক্ষীরা ভোমরা ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জয়নাল আবেদিন কিরণ বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে ট্রাকভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। আগে এক ট্রাক মাল ঢাকায় পৌঁছাতে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা খরচ হতো। বর্তমানে সেই খরচ বেড়ে ৩০ থেকে ৩৭ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। অনেক এলাকায় তেল পাওয়া যাচ্ছে না বলে আমরা ট্রাক পাঠাতে পারছি না। তিনি আরও বলেন, সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া, বগুড়া, রংপুর, কিশোরগঞ্জ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলে তেল সংকট তীব্র হওয়ায় এসব রুটে ট্রাক চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তেল সংকটের কারণে তিন থেকে চার দিন পরপর একটি করে ট্রাক ভোমরায় ঢুকছে। অনেক সময় ফল, আদা ও অন্যান্য কাঁচামাল রাস্তায় তেল ফুরিয়ে পড়ে থাকছে, বলেন তিনি।
সাতক্ষীরা শহরের বাগানবাড়ী এলাকার ট্রাকচালক কেরামত আলী জানান, ‘ভোমরা বন্দর থেকে ঢাকা অথবা নারায়ণগঞ্জে পণ্য নিয়ে যাওয়ার পথে গত কয়েক দিনে আমাকে অন্তত ৫-৬টি পাম্প ঘুরতে হয়েছে। অধিকাংশ পাম্পে তেল নেই, আবার কোথাও থাকলেও চাহিদা মত দিচ্ছে না। ২০-৫০ লিটার করে তেল সংগ্রহ করতে গিয়ে আমাদের দীর্ঘ সময় নষ্ট হচ্ছে। যে কারণে সময়মতো পণ্য নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারায় ব্যবসায়ীদের কথা শুনতে হচ্ছে। আবার পথে বাড়তি খরচের কারণে আমাদের আয়েও টান পড়ছে।’
ট্রাকচালক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তেল সংকটের কারণে আমাদের এখন দূরের ট্রিপ দিতে ভয় হচ্ছে। আগে একবার ট্যাঙ্ক ফুল করলে নিশ্চিন্তে গন্তব্যে চলে যেতাম। এখন অর্ধেক রাস্তা যাওয়ার পর তেল ফুরিয়ে গেলে পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে সময় লস হচ্ছে। গাড়ির মালিকরা ভাড়া বাড়াতে বলছেন। কারণ তাদের খরচ বেড়ে গেছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা বাড়তি ভাড়া সহজে দিতে চায় না।’
এ বিষয়ে ভোমরা স্থলবন্দরের ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ী আব্দুল গফুর সরদার বলেন, ‘বন্দরে এখন আর আগের মতো ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা ব্যবসায়ীদের কথা অনুযায়ী ট্রাক সরবরাহ করতে পারছি না। এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভোমরা স্থল বন্দরে সরকারের রাজস্ব খাত ও ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।’
তিনি বন্দরের আমদানি পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাকগুলোতে স্বাভাবিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
ভোমরা স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মুসা বলেন, ভোমরা স্থলবন্দর এখন পূর্ণাঙ্গ কাস্টম হাউসে রূপান্তর হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা নানা সুবিধা পাচ্ছেন এবং বাণিজ্য কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ঠিক এ সময় জ্বালানি সংকট আমাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। পরিবহন সংকটের কারণে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
আমদানি-রফতানি বাণিজ্য সচল রাখতে সরকারকে বিষয়টির প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে বন্দরের কার্যক্রমে আরও স্থবিরতা নেমে আসতে পারে।