জেলখানায় বসে রংপুর কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করছেন কার্যক্রম আওয়ামী লীগের রংপুর মহানগর সাধারণ সম্পাদক ও সমবায় মার্কেটের সাবেক চেয়ারম্যান তুষার কান্তি মণ্ডল। তার মৌখিক আদেশে নিয়োগপত্র ছাড়াই বেতন তুলছেন অফিসের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার সরকার, অফিস সহকারী এবং কম্পিউটার অপারেটর খায়রুন নাহার।
তাদের বেতন না দেওয়ার জন্য রংপুর আঞ্চলিক সমবায় নিবন্ধক মোখলেছুর রহমান অফিসিয়ালি আদেশ দিলেও তা অমান্য করে তাদের বেতন দিচ্ছেন সমবায় কর্মকর্তা ও বর্তমান কমিটির সভাপতি ফরিদ উদ্দিন সরকার।
এ বিষয়ে ব্যাংকে হিসাবরক্ষণ পদে কর্মরত প্রবীর কুমার সরকার বলেন, তুষার কান্তি মণ্ডল আমার নিকটাত্মীয়। তিনি আমাকে এখানে নিয়োগ দিয়েছেন। এখনো কোনো নিয়োগপত্র হাতে পাইনি। নিয়োগপত্র না থাকলেও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমাকে নিয়মিত বেতন দিচ্ছেন।
অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর খায়রুন নাহার বলেন, আমি ব্যাংকে কখন আসি, কখন যাই, নিয়োগ ছাড়াই চাকরি করি, সেটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়। আমার পেছনে লাগবেন না, তাহলে আপনাদের ক্ষতি হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে রংপুর কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের বর্তমান সভাপতি ফরিদ উদ্দিন সরকার বলেন, ইতোপূর্বে যিনি সভাপতি ছিলেন, তিনি যেভাবে প্রবীর কুমার সরকার ও খায়রুন নাহারকে বেতন দিয়েছেন, আমিও সেভাবেই তাদের বেতন দিচ্ছি।
আঞ্চলিক নিবন্ধন কর্মকর্তা বেতন দিতে নিষেধ করে চিঠি দিয়েছেন- এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
ব্যাংক অফিস সূত্রে জানা যায়, ১৯১৫ সালে রংপুর ও লালমনিরহাট অঞ্চল নিয়ে রংপুর কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক গঠিত হয়। দুই জেলার ১২ উপজেলার ৫১২টি সমিতি নিয়ে বর্তমান ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ইতোপূর্বে ব্যাংকটির সমিতির সদস্যদের মতামতে পরিচালিত হলেও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরেই তাদের দখলে চলে যায় ব্যাংকটি।
অভিযোগ আছে, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল ব্যাংক এবং মার্কেটের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে আধিপত্য খাটিয়ে সমিতির সদস্যদের কোণঠাসা করে নিজের মতো করে ব্যাংকটি পরিচালনা করতে থাকেন। তার হাত ধরে ব্যাংকটিতে অনিয়ম-দুর্নীতি শুরু হয়। কিন্তু তুষার কান্তি মণ্ডলের অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে গেলে সদস্যদের পদ অটোমেটিকলি হারিয়ে যায় বলে কেউ ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস পায় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমবায় ব্যাংক সমিতির একাধিক সদস্য জানান, ১০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে ব্যাংকটির বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ব্যাংক ভবন নির্মাণের কোনো হিসাব না দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা তুষার মণ্ডল মৌখিকভাবে অফিস সহকারী ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছেন। অথচ তাদের কোনো অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও অফিসিয়ালি কাগজপত্র নেই। তারা আওয়ামী লীগ আমল থেকে এখন পর্যন্ত বিনা নিয়োগে চাকরি করে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করছেন।
তারা আরও বলেন, এর আগে আমরা মিটিংয়ে বলেছিলাম বৈধ কাগজপত্র দেখে যোগ্যতাসম্পন্ন লোককে নিয়োগ দেওয়ার জন্য। কিন্তু তুষার মণ্ডল আওয়ামী লীগের প্রভাব দেখিয়ে সেটি করতে দেননি। এর পরে বিষয়টি আঞ্চলিক নিবন্ধন কর্মকর্তাকে জানালে তিনি লিখিতভাবে একটি চিঠি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে দেন। কিন্তু বর্তমান ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সেই চিঠিও অমান্য করে অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের বেতন দিয়ে যাচ্ছে। আমরা এর প্রতিকার চাই।
তাদের অভিযোগ করে বলেন, বহুতল ভবন করতে আওয়ামী ঘরানার প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার। খাইরুল কবির রানাকে ব্যাংকের কাজটি পাইয়ে দিয়ে তুষার মণ্ডল কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। কিন্তু জুলাই হত্যা মামলার আসামি হয়ে তুষার মণ্ডল গ্রেফতার হয়ে জেলে গেলে ঠিকাদার খাইরুল কবির রানা সমবায়ের জেলা এবং আঞ্চলিক নিবন্ধন কর্মকর্তার যোগসাজশে ভবনটির শত কোটি টাকা মূল্যের গ্রাউন্ড ফ্লোর, চতুর্থ ও পঞ্চম তলার ১০৫টি দোকান কৌশলে তার নামে করে নিয়েছেন।
এ বিষয়ে ঠিকাদার খাইরুল কবির রানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সবকিছু শুনে পরে কথা বলবেন বলে জানান।
রংপুর জেলা সমবায় কর্মকর্তা ও ব্যাংক পরিচালনা কমিটির সদস্য জুবায়ের ইসমাইল বলেন, ব্যাংকটি একটি কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এর সভাপতি করা হয়েছে আমাদের কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন সরকারকে। তাকে নিয়ম মোতাবেক ব্যাংকটি পরিচালনার জন্য বলা হয়েছে। যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে, সেটি খতিয়ে দেখা হবে।
রংপুর সমবায় অধিদপ্তরের আঞ্চলিক নিবন্ধক মোখলেছুর রহমান বলেন, রংপুর কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের অনেক অনিয়ম এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আগেও তদন্ত করেছি। সে রিপোর্টগুলো ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকে কিছু নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যে নিয়োগগুলোর কোনো বৈধতা নেই। বিষয়টি তদন্ত করে অফিশিয়ালি চিঠি দিয়ে তাদের বেতন বন্ধ করতে বলেছি। তারপরেও যদি কোনো কর্মকর্তা তাদের বেতন-ভাতা দেন, দায়ভার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিতে হবে।
সময়ের আলো/জোই।