গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার চাঁন্দের বাজার এলাকায় ঘাঘট নদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা কাঠের সাঁকোটিকে দূর থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই এটাই দুই ইউনিয়নের মানুষের চলাচলের একমাত্র পথ। কাছে গেলে দৃশ্যটা বদলে যায়। পচে যাওয়া কাঠ, ঢিলে হয়ে যাওয়া পাটাতন আর পা ফেললেই কেঁপে ওঠা পুরো কাঠামো যেন প্রতিটি পথচারীকে মনে করিয়ে দেয় এ পথ নিরাপদ নয়, তবু বিকল্পও নেই।
নদীর একপাশে দামোদরপুর, অন্যপাশে রসুলপুর ইউনিয়ন। মাঝখানে ঘাঘট নদ আর এই নদই আলাদা করে রেখেছে প্রায় ১৫ গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রা। প্রতিদিন স্কুলগামী শিশু, কৃষক, দিনমজুর, বৃদ্ধ কিংবা অসুস্থ মানুষ সবার পথ একটাই। সেই পথের নাম এখন ‘নড়বড়ে সাঁকো’।
স্থানীয়দের ভাষায়, এই সাঁকো শুধু একটি কাঠের কাঠামো নয়, এটি তাদের প্রতিদিনের সংগ্রামের প্রতীক। প্রায় এক দশক আগে সরকারি সহায়তা না পেয়ে নিজেদের উদ্যোগেই সাঁকোটি নির্মাণ করেছিলেন তারা। কেউ দিয়েছেন টাকা, কেউ কাঠ, কেউবা শ্রম। তখন এটি ছিল স্বস্তির এক নতুন পথ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পথই এখন ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সকালে যখন শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে সাঁকো পার হয়, তখন অনেক অভিভাবকের চোখে থাকে উৎকণ্ঠা। কোনো কোনো জায়গায় কাঠ ভেঙে গেছে, কোথাও আবার পাটাতন দেবে গেছে। পা ফসকালেই নদে পড়ে যাওয়ার শঙ্কা। তবু প্রতিদিনই মানুষ পার হচ্ছে, কারণ থেমে থাকার সুযোগ নেই।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, প্রতিদিন এই সাঁকো দিয়ে কত ছাত্রছাত্রী যায়। আমরা নিজেরাও ভয়ে পার হই। কিন্তু উপায় কী?
আরেকজন জানান, আমরাই চাঁদা তুলে বানিয়েছিলাম। এখন প্রতি বছরই মেরামত করতে হয়। কিন্তু আগের মতো মজবুত নেই সাঁকোটি।
এই সাঁকোর ওপর নির্ভর করছে দুই ইউনিয়নের মানুষের নিত্যদিনের জীবন। অসুস্থ কাউকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কৃষকের উৎপাদিত ফসল বাজারে নিতে গিয়ে বাড়তি সময় ও খরচ গুনতে হয়। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও এর প্রভাব স্পষ্ট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে একটি স্থায়ী সেতুর দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাস মিললেও বাস্তবতা বদলায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে গাইবান্ধা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম বলছেন, সেতু নির্মাণের প্রক্রিয়া এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে।
এলজিইডির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রকল্পটি ফিজিবিলিটি স্টাডির মধ্যে রয়েছে। সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেতুগুলোর তালিকা তৈরি করে পর্যায়ক্রমে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। এরপর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) অনুমোদিত হলে কাজ শুরু হতে পারে।
এদিকে সময় যেন থেমে নেই। প্রতিদিনের ব্যবহার আর প্রাকৃতিকভাবে ক্ষয়ে সাঁকোটি আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। সামনে বর্ষা মৌসুম তখন ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
ঘাঘট নদের দুই পাড়ের মানুষের কাছে একটি পাকা সেতু শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি তাদের নিরাপত্তা, স্বস্তি আর উন্নয়নের স্বপ্ন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখনও কাগজে-কলমে আটকে আর বাস্তবে প্রতিদিন পার হচ্ছে নড়বড়ে এক সাঁকোর ওপর ভর করে।