খরচ হওয়া ১৫৩ কোটি টাকার পুরোটাই গচ্চা

আদিল সরকার

সারাদেশ

অবশেষে বাতিল করা হচ্ছে সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদকে উপহার দেওয়া আলোচিত সেই পাঁচ হাজার ৬৫১ কোটি টাকার উড়াল সড়ক নির্মাণ

2026-04-22T02:46:06+00:00
2026-04-22T02:46:06+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
খরচ হওয়া ১৫৩ কোটি টাকার পুরোটাই গচ্চা
আদিল সরকার
প্রকাশ: বুধবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৬, ২:৪৬ এএম 
সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ। ছবি : সংগৃহীত
অবশেষে বাতিল করা হচ্ছে সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদকে উপহার দেওয়া আলোচিত সেই পাঁচ হাজার ৬৫১ কোটি টাকার উড়াল সড়ক নির্মাণ প্রকল্প। কিশোরগঞ্জের মিঠামইনের হাওড়ে নেওয়া প্রকল্পটির শুরু থেকেই পরিবেশবাদীদের আপত্তি ছিল। তবে তখনকার সরকারের চাপে পরিকল্পনা কমিশনের কিছু করার ছিল না বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। 

সর্বশেষ জুলাই আন্দোলনে হাসিনা সরকারের পতনের পর হাওড়ের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় এই প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। অন্যদিকে প্রকল্পটির জন্য ইতিমধ্যেই ১৫৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেছে, যা কার্যত অপচয়। 
বুধবার পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটি বাদ দেওয়ার জন্য প্রস্তাব উঠেছে বলে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রায় ৫ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। সাবেক ওই রাষ্ট্রপতির বিদায়ের আগমুহূর্তে তার নিজের এলাকায় এই প্রকল্পটি উপহার হিসেবে হাসিনা সরকার দেয় বলে জানা গেছে। 

প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল হাওড়ের ওপর ১৫.৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ উড়াল সড়ক নির্মাণ করে মিঠামইন, ইটনা, অষ্টগ্রামসহ বিস্তীর্ণ এলাকার সঙ্গে কিশোরগঞ্জ জেলা সদর এবং ঢাকার সার্বক্ষণিক সড়ক যোগাযোগ স্থাপন করা। প্রকল্পের আওতায় সড়ক প্রশস্তকরণ, সেতু, কালভার্ট, টোল প্লাজা ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনাও ছিল।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রগতি ছিল অত্যন্ত ধীর। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১৫৩ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ২.৭২ শতাংশ; আর বাস্তবে অগ্রগতি মাত্র ৩ শতাংশ। শুধু জমি অধিগ্রহণেই ব্যয় হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। এই সীমিত কাজের পরই প্রকল্পটি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে ইতিমধ্যে ব্যয় হওয়া এই অর্থ কার্যত অপচয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। উড়াল সড়ক হলে ২০৩০ সালে প্রতিদিন এই উড়াল সড়ক দিয়ে ২৫ হাজার ৮০০টি যানবাহন চলাচল করবে বলে জানিয়েছিল সেতু বিভাগ। অথচ পদ্মা সেতু দিয়েও দিনে এত গাড়ি চলাচল করে না বলে জানা গেছে।

জানা যায়, প্রকল্পটি বাতিলের পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পরিবেশগত উদ্বেগ। হাওড়ের সংবেদনশীল জলাভূমিতে উড়াল সড়ক নির্মাণে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এমন আশঙ্কায় পরিবেশবিদরা শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে সেতু বিভাগের প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা সভায় বিষয়টি গুরুত্ব পায় এবং শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি ‘অসমাপ্ত রেখে সমাপ্ত’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অর্থাৎ পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন না করেই তা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।

গত বছরের ২৭ এপ্রিল সেতু বিভাগের আওতাধীন চলমান, প্রক্রিয়াধীন বৃহৎ প্রকল্পসংক্রান্ত একটি পর্যালোচনা সভা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় এই প্রকল্প গ্রহণের ফলে হাওড় অঞ্চলের জলাভূমিতে বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা রয়েছে মর্মে পরিবেশবাদীরা সোচ্চার হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয় এবং তারই আলোকে কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন উপজেলা সদর থেকে করিমগঞ্জ উপজেলার মরিচখালি পর্যন্ত উড়াল সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তারই আলোকে প্রকল্পের অনুমোদিত কাজ অসমাপ্ত রেখে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে মূল ডিপিপি সংশোধন করে ব্যয় কমিয়ে ১৫৩ কোটি ৯২ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে, যা মূল অনুমোদিত ব্যয়ের প্রায় ৯৭ শতাংশ হ্রাস। নতুন প্রস্তাবে মূল অবকাঠামোগত কাজ বিশেষ করে উড়াল সড়ক নির্মাণ সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে যখন প্রকল্পটি তড়িঘড়ি করে অনুমোদনের জন্য একনেকে তোলা হয় তখনি আপত্তি উঠেছিল। জানা যায়, অন্য প্রকল্পের তুলনায় এই প্রকল্পে জনবল নিয়োগের জন্য দ্রুত সুপারিশ করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

পরিকল্পনাসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তখন যুক্তি দিয়েছিলেন, হাওড় এলাকার মানুষকে সারা বছর পানিবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত করতে এ ধরনের অবকাঠামো দরকার। তবে বাস্তবে প্রকল্পটির ব্যয়ও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি ধরা হয়েছিল। প্রতি কিলোমিটার উড়াল সড়ক নির্মাণে যেখানে অন্য প্রকল্পে ১০০ থেকে ১৪৯ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, সেখানে এখানে ধরা হয়েছিল প্রায় ১৮১ কোটি টাকা। একইভাবে সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রেও ব্যয় ছিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি। 

পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটির শুরু থেকে পরিবেশবাদীদের আপত্তি ছিল। তখন সরকারের চাপে পরিকল্পনা কমিশনের কিছু বলার ছিল না। যে খরচ হয়েছে সেটা জমি অধিগ্রহণে। তাই কোনো সমস্যা হবে না।


  বিষয়:   রাষ্ট্রপতি  আব্দুল  হামিদ  কিশোরগঞ্জ  মিঠামইন 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: