নদীবেষ্টিত জেলা গাইবান্ধায় নৌদুর্ঘটনা বা পানিতে নিখোঁজের ঘটনা নতুন কিছু নয়। বর্ষা মৌসুমে নদীর স্রোত বেড়ে গেলে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে। অথচ এমন একটি জেলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের নিজস্ব কোনো ডুবুরি ইউনিট নেই। ফলে প্রতিটি নদী দুর্ঘটনায় উদ্ধার কার্যক্রম শুরুতেই তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা ও বিলম্ব। এতে জননিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
জেলা ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, গাইবান্ধায় কেউ নদীতে নিখোঁজ হলে বা নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। কারণ, এ জেলায় প্রশিক্ষিত ডুবুরি না থাকায় রংপুর থেকে ডুবুরি দল আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এতে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, যা অনেক ক্ষেত্রে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়।
গাইবান্ধা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক মাহমুদুল হাসান বলেন, নদী দুর্ঘটনায় ‘সময়’ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু স্থানীয়ভাবে ডুবুরি না থাকায় দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করা যায় না। তিনি বলেন, রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে ডুবুরি দলকে সমন্বয় করে পাঠানো হয়। তবে দূরত্বের কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সময় লাগে। এতে উদ্ধার কার্যক্রমে বিলম্ব হয়, যা অনেক সময় প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টিকে গুরুতর নিরাপত্তা ঘাটতি হিসেবে দেখছেন।
কামারজানি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান বলেন, গাইবান্ধা নদীবেষ্টিত এলাকা। এখানে প্রায়ই নৌকা ডুবি, পানিতে পড়ে যাওয়া বা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে ডুবুরি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে জীবিত উদ্ধার সম্ভব হয় না। এটি খুবই উদ্বেগজনক।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, নদীপথই অনেক মানুষের দৈনন্দিন চলাচল ও জীবিকার অন্যতম মাধ্যম। বিশেষ করে চরাঞ্চলের মানুষদের জন্য নৌকাই ভরসা। তাই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তাদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধার কার্যক্রম শুরু না হলে হতাহতের আশঙ্কা বেড়ে যায়।
সুন্দরগঞ্জের চরাঞ্চলের বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুস বলেন, নদীতে কেউ ডুবে গেলে আমরা নিজেরাই খোঁজাখুঁজি করি। ডুবুরি দল আসতে অনেক সময় লাগে। ততক্ষণে সব শেষ হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীপ্রধান জেলাগুলোতে দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। আধুনিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত ডুবুরি এবং স্থানীয় পর্যায়ে স্থায়ী ইউনিট থাকলে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ডুবুরি নিয়োগই নয়, পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম সরবরাহ করাও জরুরি। এতে প্রাথমিক পর্যায়ে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।
জেলার সচেতন মহল মনে করছে, গাইবান্ধার মতো নদীবেষ্টিত জেলায় ডুবুরি ইউনিট না থাকা বড় ধরনের অব্যবস্থাপনার উদাহরণ। দ্রুত একটি স্থায়ী ডুবুরি ইউনিট স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবি তাদের।
নদী ঘেরা এই জনপদে প্রতিটি মুহূর্তেই লুকিয়ে থাকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। আর সেই ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে স্থানীয়দের একটাই প্রত্যাশা-দুর্ঘটনার পর যেন উদ্ধার দলের জন্য অপেক্ষা করতে না হয়। তাহলে বাঁচানো যাবে আরও প্রাণ।
আরবিএন