আজ শুরু হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে প্রথম দফার বিধানসভা নির্বাচন। প্রথম দফায় এদিন মোট পশ্চিমবঙ্গের ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ। বাকি আসনগুলোর ভোটগ্রহণ হবে আগামী ২৯ এপ্রিল। ফল প্রকাশ ৪ মে। নজিরবিহীন ২ হাজার ৪০০-এর বেশি কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী, কঠোর বিধিনিষেধ, ভোটার তালিকা থেকে বিপুল নাম বাদ পড়ার বিতর্ক এবং বিজেপির আক্রমণাত্মক নির্বাচনি কৌশল এই ভোটকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। তবু বিভিন্ন জরিপ, আসনভিত্তিক গাণিতিক বিশ্লেষণ এবং পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়নে তৃণমূল কংগ্রেস এখনও সামান্য হলেও এগিয়ে। জরিপ প্রতিষ্ঠান সি ভোটারের যশবন্ত দেশমুখ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক মঈদুল ইসলাম, শুভময় মৈত্রসহ একাধিক মূল্যায়নে বলা হচ্ছে- লড়াই হাড্ডাহাড্ডি হলেও তৃতীয় শক্তির ভাঙন, সংখ্যালঘু ভোটের সম্ভাব্য পুনঃসংহতি এবং শাসক দলের সাংগঠনিক শক্তি তৃণমূলকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। ফলে বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকারের নানা তৎপরতা সত্ত্বেও জয়ের পাল্লা আপাতত তৃণমূলের দিকেই ভারী।
নজিরবিহীন নিরাপত্তা, ভোটে ভিন্ন বার্তা : এই ভোটের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক বিপুল নিরাপত্তা সমাবেশ। ২ হাজার ৪০৭ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনি ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ। শুধু মুর্শিদাবাদেই ৩১৬ কোম্পানি বাহিনী রাখা হয়েছে। বাইক চলাচলে নিয়ন্ত্রণ, আগাম আটক অভিযান, আবাসন নজরদারি, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ- সব মিলিয়ে ভোটকে প্রায় নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তা পরিসরে আনা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এটিকে শান্তিপূর্ণ ভোটের প্রস্তুতি বললেও সমালোচকদের একাংশ বলছেন, এটি শুধু প্রশাসনিক নয়, রাজনৈতিক বার্তাও বহন করছে। বিশেষ করে এত বিপুল বাহিনী ভোটার মনস্তত্ত্বে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও আলোচনা আছে। তবে সহিংসতা রোধে এই নিরাপত্তা বড় ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়ে দ্বিমত কম।
আরও পড়ুন
দ্বিমুখী লড়াই, তৃতীয় শক্তির ভাঙন : নির্বাচনি সমীকরণে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো এই ভোট মূলত তৃণমূল ও বিজেপির সরাসরি লড়াই। দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিশ্লেষণ বলছে, অধিকাংশ আসনেই তৃতীয় শক্তি নির্ণায়ক নয়। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী মঈদুল ইসলামের মতে, বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় বিকল্প না থাকলে ভোট দ্বিমুখী কাঠামোয় ফিরে যায়। এই বাস্তবতায় বিরোধী ভোট পুরোপুরি বিজেপির দিকে না গিয়ে অনেক জায়গায় ছড়িয়ে থাকছে, যা তৃণমূলের জন্য বাফার তৈরি করছে। এই জায়গাটিই এখন পশ্চিমবঙ্গের শাসক শিবিরের অন্যতম শক্তি।
এসআইআর বিতর্কে নাড়া খাওয়া সমীকরণ : এই নির্বাচনের কেন্দ্রীয় বিতর্ক ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা। প্রায় ৯০ লাখ নাম বাদ পড়ার অভিযোগ নির্বাচনি সমীকরণে বড় প্রভাব ফেলেছে। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় এর অভিঘাত বেশি- এমন অভিযোগ এসেছে নানা পর্যবেক্ষণে। বিজেপি এটিকে শুদ্ধিকরণ বললেও বিরোধীরা পরিকল্পিত ভোট প্রকৌশল বলছে। এখানেই নির্বাচনের নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন একসঙ্গে জুড়ে গেছে। ভোটের মাঠে এই বিতর্ক বাস্তবে কতটা ফল পাল্টাবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
বিজেপির কৌশল বনাম উল্টো প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা : বিজেপির ভরসা শাসনবিরোধী ক্ষোভ, ভোটার তালিকা পুনর্বিন্যাসের সম্ভাব্য প্রভাব এবং উত্তরবঙ্গসহ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে সংগঠন। কিন্তু এনডিটিভির আসন-সিমুলেশন এবং সি ভোটারের যশবন্ত দেশমুখের বিশ্লেষণ বলছে, এই সমীকরণ সরল নয়। বাদ পড়া ভোট সরাসরি বিজেপির ভাগে যাবে- এমন নিশ্চয়তা নেই। উল্টো ক্ষোভ ও সহানুভূতি প্রতিক্রিয়ায় শাসক দলও লাভবান হতে পারে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটে প্রতিরক্ষামূলক সংহতি তৈরি হলে সেটি তৃণমূলের পক্ষে যেতে পারে।
জরিপ-সমীকরণে কেন এগিয়ে তৃণমূল : বিভিন্ন আসনভিত্তিক প্রক্ষেপণ বলছে, লড়াই কঠিন হলেও তৃণমূল এখনও সরকার গঠনের সীমার ওপরে থাকতে পারে। কিছু বেসরকারি নির্বাচনি ট্র্যাকার ১৫৫ থেকে ১৭৫ আসনের পরিসর দেখাচ্ছে। বিজেপির সম্ভাব্য পরিসর তুলনামূলক নিচে। শুভময় মৈত্রর মূল্যায়ন, বিরোধী বিভাজন বিজেপির পূর্ণ সুবিধা নিশ্চিত করছে না। মঈদুল ইসলামের যুক্তি, দ্বিমুখী লড়াইয়ে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী পক্ষ বাড়তি সুবিধা পায়। নারী ভোট, কল্যাণভিত্তিক সমর্থন, স্থানীয় নেটওয়ার্ক- এই বাস্তব ফ্যাক্টরগুলোও তৃণমূলের পক্ষে যাচ্ছে।