জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের পরিবহন সুবিধার পাশাপাশি শিক্ষকদের সন্তানদের স্কুলে আনা-নেওয়ার জন্য বিশেষ বাসসেবা চালু রয়েছে। তবে এই খাতে বছরে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ভর্তুকি প্রদান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাজেট ঘাটতির অভিযোগের মধ্যেই এই ব্যয়ের বিষয়টি সামনে আসায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষক পোষ্যদের পরিবহনের জন্য নির্দিষ্ট কয়েকটি রুটে প্রতিদিন নিয়মিত বাস চলাচল করে। এসব বাস সাভার সেনা পাবলিক স্কুল, সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এবং মর্নিং গ্লোরি স্কুলে শিক্ষকদের সন্তানদের আনা-নেওয়া করে থাকে।
এর মধ্যে অরুণাপল্লী-ক্যাম্পাস-মর্নিং গ্লোরি স্কুল রুটে চলাচলকারী একটি বাস প্রতিদিন ৫টি ট্রিপে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। অন্যদিকে অরুণাপল্লী-ক্যাম্পাস-সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল-সেনা পাবলিক স্কুল রুটে চলাচলকারী বাস প্রতিদিন ৯টি ট্রিপে প্রায় ২৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। ফলে দুটি রুট মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৯৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করা হয়।
এই দীর্ঘ পথ অতিক্রমে প্রতিদিন প্রায় ১৫৮ লিটার জ্বালানি খরচ হয়, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ টাকা। এছাড়া চালক ও হেল্পারদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের কারণে ওভারটাইম ভাতা এবং বাস রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ দৈনিক আরও প্রায় ৪ হাজার ৬০১ টাকা ব্যয় হয়। সব মিলিয়ে প্রতিদিন এ খাতে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২০ হাজার ৪০১ টাকা, যা মাসিক হিসেবে প্রায় ৪ লাখ ৮ হাজার টাকায় পৌঁছায়।
অন্যদিকে, এ সেবা ব্যবহারকারী শিক্ষক পোষ্যদের কাছ থেকে মাসিক ফি হিসেবে আদায় হয় মাত্র ৭৪ হাজার টাকা। ফলে প্রতি মাসে বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। বছরে এই ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪০ লাখ ৮ হাজার টাকা। গত এক দশকে এই খাতে মোট ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরতদের জন্য পরিবহন সুবিধা থাকা স্বাভাবিক হলেও শিক্ষক পোষ্যদের জন্য এ ধরনের বিশেষ সুবিধা নিয়ে আগে থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনা ছিল। তবে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির বিষয়টি সামনে আসার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সংকট বিদ্যমান। ক্লাসরুমের অভাবে অনেক সময় খোলা আকাশের নিচে মুক্তমঞ্চ, সপ্তম ছায়ামঞ্চ বা মহুয়া মঞ্চে ক্লাস নিতে বাধ্য হন শিক্ষকরা। একইভাবে অর্থসংকটের কারণে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) ভবনের নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে থেমে আছে। আইন অনুষদ, তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউট এবং বিজনেস স্টাডিজ অনুষদসহ বিভিন্ন বিভাগের ক্লাসরুম সংকট এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিদ্যমান থাকলেও নতুন ভবন নির্মাণে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটের প্রায় ৭৫ শতাংশই বেতন-ভাতা, পেনশন ও অবসর সুবিধায় ব্যয় হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষক পোষ্যদের পরিবহন খাতে বিপুল ভর্তুকিকে অনেক শিক্ষার্থী ‘অযাচিত ও অযৌক্তিক’ বলে অভিহিত করছেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থী স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশাসনের কাছে সহায়তা চাইলে প্রায়ই বাজেট ঘাটতির কথা বলা হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের স্বার্থের বাইরের খাতে এমন বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে-এটি প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের কাছে জবাবদিহি চেয়েছি।
জাবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, পরিবহন ও চিকিৎসা খাতে স্পষ্ট আর্থিক সংকট রয়েছে। এই অবস্থায় পোষ্য পরিবহনে ভর্তুকি বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যয় করা উচিত।
তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে এবং তা হঠাৎ বন্ধ করা সহজ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আবদুর রব বলেন, এটি একটি পুরোনো ব্যবস্থা। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ব্যয় বহন করা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট খাতে ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে এখন প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীসহ সচেতন মহল। পোষ্য পরিবহন ভর্তুকি বহাল থাকবে, নাকি তা পুনর্বিন্যাস করা হবে-সে সিদ্ধান্তের দিকেই এখন সবার দৃষ্টি।
জোই/কেএইচও