জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বড় পরিসরে জ্বালানি তেল আমদানি অব্যাহত রেখেছে সরকার। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় সাশ্রয়, নিয়ন্ত্রণ এবং বহুমুখী উদ্যোগ জোরদার করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি করেছে। তারপরও বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ। এটি শুধু একটি অনৈতিক কাজ ও মারাত্মক অপরাধ। এ ছাড়া এটি জননিরাপত্তার জন্য এক ধরনের হুমকি।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেড়ে চলা অবৈধ তেল মজুদ ও কালোবাজারির প্রবণতা ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে। এ অবস্থার পেছনে রয়েছে অজ্ঞতা, অনিয়ম ও নিয়ন্ত্রণের অভাব; যার ফলে দুর্ঘটনা আর মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তেল মজুদে মৃত্যুঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। সম্প্রতি ফটিকছড়িতে তেল মজুদ করতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ হয়ে সহকারী ব্যবস্থাপকের মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনা শুধুই এক ব্যক্তির মৃত্যু নয়, এটি আমাদের অব্যবস্থাপনা ও অনিরাপদ মজুদ পদ্ধতির ভয়াবহতাকে প্রকাশ করে।
অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি এতটাই বেশি যে, যেখানে যেখানে অপ্রয়োজনীয়ভাবে তেল সংরক্ষণ হচ্ছে, সেখানেই বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, খোলা বা অনিরাপদ পাত্রে জ্বালানি সংরক্ষণে অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা অনেক বেশি।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়– গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার এক গ্রামে বাড়ির বারান্দায় রাখা ডিজেল ড্রামে পড়ে আড়াই বছরের এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। অবৈধ মজুদ বন্ধে সরকারের কঠোর উদ্যোগ থাকলেও, বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না।
অনেকেরই ধারণা, তেল মজুদ ও কালোবাজারির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অসাধু চক্রগুলোর শাস্তির ভয় না থাকায় নিয়ম ভেঙে অবাধে কাজ করে যাচ্ছে। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে এই অবৈধ কাজের জন্য সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন দণ্ডের বিধান থাকলেও বাস্তবে তা প্রয়োগ হচ্ছে না। এর ফলে ভয়াবহতা বাড়ছে, আর মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে চলছে।
আশঙ্কা জাগে, দেশের সীমান্ত থেকে শুরু করে গ্রামীণ এলাকাগুলোতেও অবৈধ তেল চোরাচালান ও মজুদ বেড়ে গেছে। পাচারকারীরা সীমান্ত দিয়ে অপ্রচলিত পথ ধরে অবৈধভাবে তেল নিয়ে যাচ্ছে প্রতিবেশী দেশে। এ সবই ঝুঁকির পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যা কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং দেশের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।
চরম বিপদে পড়েছে সাধারণ মানুষ। ট্যাঙ্ক ভরে তেল নেওয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে অনেক পরিবার। গুজব ও অতিরিক্ত লাভের লোভে বাজারে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম সংকট। এতে সাধারণ ক্রেতারা বেশি দামে তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছে, আবার অনেকে মজুদ করছে অপ্রয়োজনে। ফলে সরবরাহের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত হচ্ছে, যা সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে সতর্কতা জানানো হয়েছে যে, লাইসেন্স ছাড়া কোথাও তেল মজুদ বা সংরক্ষণ বৈধ নয়। এর ফলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়। সম্প্রতি ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ তেল জব্দ করেছে। তবে এই ধরনের অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকলেও, অবৈধ কার্যকলাপের ভয়াবহতা কমছে না।
অবশ্য এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার ও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। সাধারণ নাগরিকদের সচেতন করতে হবে যে, অনিরাপদভাবে তেল সংরক্ষণ মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তেল সংরক্ষণে নিয়ম মানা ও আইন মেনে চলা সবার দায়িত্ব। অন্যথায় এই ‘টাইম বোমা’ আমাদের সমাজের জন্য বড় ধরনের বিপদ হয়ে উঠবে।
তেল মজুদ ও কালোবাজারি বন্ধে সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি। সরকারের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি সচেতন নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। এভাবেই প্রতিরোধ সম্ভব, নয়তো মৃত্যুঝুঁকি আর অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা দিন দিন বাড়তেই থাকবে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে এবং সচেতনতা বাড়াতে হবে, যেন নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে পারি।
এফআর