বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক পরিসরে নারী দ্রষ্টা, ভবিষ্যতদ্রষ্টা কিংবা জ্ঞানসমৃদ্ধ নারীর যে চিত্র বারবার ফিরে আসে, তা বিস্ময়করভাবে স্থিতিশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ। কখনো বাংলার কৃষিনির্ভর জনপদে, কখনো প্রাচীন গ্রিসের পবিত্র উপবনে, কখনো নর্স পুরাণের কল্পলোকে, আবার কখনো উত্তর ইউরোপের কুয়াশাচ্ছন্ন প্রান্তরজুড়ে— নারীরা বহু সময়েই এমন এক জ্ঞানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কল্পিত হয়েছেন, যা সাধারণ উপলব্ধির অতীত। এই রচনায় খনা, সিবিল, ভলভা এবং উইতে উইভেন, এই চারটি চরিত্রকে লোকসংস্কৃতি অধ্যয়ন ও নারীবাদী নৃতত্ত্বের আলোকে জানা-বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। যদিও এই চরিত্রগুলোর মধ্যে নারী-অন্তর্দৃষ্টির একটি সাধারণ আদল বিদ্যমান, তবুও তাদের পার্থক্যগুলো দেখায় যে জ্ঞান, কর্তৃত্ব ও লিঙ্গ কিভাবে সংস্কৃতিগতভাবে নির্মিত।
খনা ও মৌখিক কৃষিভিত্তিক জ্ঞানতত্ত্ব
বাংলা লোকজ ঐতিহ্যে খনা এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছেন, কারণ তিনি প্রয়োগধর্মী কৃষিজ জ্ঞানের ধারক। তাঁর বচনসমূহ, যা ‘খনার বচন’ নামে পরিচিত, সংক্ষিপ্ত, ছন্দময় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মৌখিকভাবে প্রচারিত। মৌখিক ঐতিহ্য গবেষণা অনুযায়ী, এ ধরনের জ্ঞান স্মরণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে ছন্দ, সংক্ষিপ্ততা ও রূপকের ওপর নির্ভর করে। যখন তিনি বলেন, ‘যদি হয় চৈতে বৃষ্টি, তবে হবে ধানের সৃষ্টি’, ‘ধরলে পোকা দিবি ছাই, এর ভাল উপায় নাই’, ‘চালায় চালায় কুমড়ো পাতা, লক্ষী বলেন আছেন তথা’, ‘গাই পালে মেয়ে, দুধ পড়ে বেয়ে’, ‘চৈতের কূয়া আমের ক্ষয়, তাল তেতুঁলের কিরা হয়’, তখন এসব কোনো ভবিষ্যদ্বাণী বা ধাঁধা হিসেবে প্রতিভাত হয় না; এগুলো ছন্দে গাঁথা সংক্ষিপ্ত কৃষিজ্ঞান, অভিজ্ঞতার নিটোল নির্যাস, বেঁচে থাকার সারাৎসার। এসবই অস্পষ্টতাকে গুরুত্ব দেওয়া ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ধারার বিপরীতে, খনার উক্তিগুলো স্পষ্টতা ও সরাসরি প্রয়োগযোগ্যতার জন্য স্বতন্ত্র। ফসলের চক্র, আবহাওয়ার ধরন এবং মাটির বৈশিষ্ট্য বিষয়ে তাঁর নির্দেশনা এক ধরনের ‘কৃষিভিত্তিক জ্ঞানতত্ত্ব’-এর প্রতিফলন, যা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও সাংস্কৃতিক ভাষার মাধ্যমে প্রকাশিত। নারীবাদী নৃতত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে খনার কিংবদন্তি; বিশেষত তাঁর জিহ্বা কেটে নেওয়ার গল্প গায়ত্রী স্পিভাকের ‘অধীনস্ত কণ্ঠস্বর’ তত্ত্বের মাধ্যমে বিশ্লেষণযোগ্য। তাঁর এই নীরবতা তথা জৈবিক কন্ঠহীনতা সত্ত্বেও লোকমুখে তাঁর উপস্থিতি এক বৈপরীত্য নির্দেশ করে অর্থাৎ প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা নারীর কণ্ঠ দমন করতে পারে বটে, কিন্তু সামষ্টিক স্মৃতি তাকে সংরক্ষণ ও প্রচার করে। ফলে খনা একইসাথে জ্ঞানগত প্রান্তিকতা ও স্থিতিস্থাপকতার প্রতীক।
সিবিল ও দেবকূলের মধ্যস্থতা
সিবিল এমন এক জ্ঞানের মডেল তথা প্রকাশকে প্রতিনিধিত্ব করে, যা দেবীয় অধিকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে সিবিলরা দেবতা ও মানুষের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন এবং তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল প্রায়ই গুপ্তার্থপূর্ণ ও বহুস্তরীয় ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। যেমন তিনি বলতেন, ‘ঈগল যখন রক্ত পান করবে, তখন এক মহা সাম্রাজ্যের পতন ঘটবে।’ কিংবা ‘আগুন ও ছাই অন্যায়কে শুদ্ধ করবে।’ খনা যেখানে কার্যকারণের স্পষ্টতা দেন, সেখানে সিবিল গূঢ়তা সৃষ্টি করেন; খনা যেখানে নির্দেশ দেন, সিবিল সেখানে ভবিষ্যৎ ইঙ্গিত করেন। সাম্রাজ্যের পতন কিংবা বিপর্যয়ের পূর্বাভাস, তাঁর বাণী শক্তিশালী হয়ে ওঠে ঠিক এই কারণে যে তা তৎক্ষণাৎ অনুধাবনযোগ্য নয়। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে সিবিল এমন এক সংস্কৃতির প্রতিফলন, যেখানে সত্য দেবাবিষ্টতার মাধ্যমে প্রাপ্ত, এবং যেখানে নারীর কণ্ঠ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নয়, বরং দেবতার মুখপাত্র হিসেবে শক্তি অর্জন করে। লোকসংস্কৃতি গবেষণার দৃষ্টিতে সিবিলের উচ্চারণ নৃতাত্ত্বিক রিচার্ড বাওমেন বর্ণিত ‘পারফরম্যান্স’ ধারণার উৎকৃষ্ট উদাহরণ যেখানে ভাষা হয়ে ওঠে আনুষ্ঠানিক, প্রতীকঘন এবং বিশেষভাবে চিহ্নিত। তাঁর কর্তৃত্ব ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে নয়, বরং দেবীয় শক্তির বাহক হিসেবে তাঁর ভূমিকা থেকে উদ্ভূত। যদিও নারীবাদী বিশ্লেষণ এই ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তথাপি ‘সিবিল’ শক্তিশালী হিসেবে প্রতিভাত হন কেননা তাঁর কণ্ঠ প্রকৃতপক্ষে তাঁর নিজের নয়; অ্যাপোলোর মতো পুরুষ দেবতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই প্রেক্ষাপট অথরাইজড ফিমেল স্পিচ বা ‘অনুমোদিত নারী-কণ্ঠস্বর’-এর ধারণাকে তুলে ধরে—যেখানে নারী তখনই কথা বলার অনুমতি পায়, যখন তা পিতৃতান্ত্রিক বা দেবীয় কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অতএব, খনার স্বতন্ত্র ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক জ্ঞানের বিপরীতে, সিবিলের কর্তৃত্ব নির্ভরশীল ও পরোক্ষ।
ভলভা ও পৌরাণিক সময়চেতনা
নর্স ঐতিহ্যের ভলভা আরেকটি ভিন্ন জ্ঞানভূমির প্রতিনিধিত্ব করে, যা পৌরাণিক সময়চেতনা ও বিশ্বতাত্ত্বিক বয়ানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ভলুসপা (Völuspá) গ্রন্থে, ভলভা সৃষ্টির সূচনা থেকে র্যাগনারকের (Ragnarök) ধ্বংস পর্যন্ত সমগ্র মহাজাগতিক ইতিহাস বর্ণনা করেন যেমন ‘I remember giants from earliest times, They who reared me long ago;’ (Völuspá-Stanza 2) কিংবা ‘The sun turns black, earth sinks into the sea, bright stars vanish from the sky’ (Völuspá-Stanza 55)। এখানে ভলভার উক্তি খনার মতো মাটিবর্তী বাস্তবতায় নিবিষ্ট না হয়ে, ‘জ্ঞান’ এক পৌরাণিক স্তরে কাজ করে। তিনি বপন বা ফসল তোলার নির্দেশ দেন না; বরং অস্তিত্বের নিজস্ব বিন্যাস উন্মোচন করেন। নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে তিনি সেই সমাজচেতনার প্রতীক, যা আচারনির্ভর নারীকণ্ঠের মাধ্যমে ভাগ্য ও সময়কে অনুধাবন করতে চায়। নৃতাত্ত্বিকভাবে ভলভার ভূমিকা এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, যেখানে কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি পবিত্র জ্ঞানের ধারক হিসেবে বিবেচিত হন। তাঁর পরিবেশনাগুলো, যা প্রায়ই ধোয়াচ্ছন্ন বা দূরবর্তী অবস্থান ও আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত, দৈনন্দিন জীবনের বাইরে এক বিশেষ জ্ঞানব্যবস্থার অংশ। আর তাই নারীবাদী দৃষ্টিতে ভলভা এক জটিল চরিত্র হিসেবে পরিলক্ষিত হন। যেখানে সিবিলের তুলনায় তিনি অধিক স্বায়ত্তশাসিত; তাঁর কর্তৃত্ব কেবল প্রবাহমান নয়, বরং তাঁর মধ্যেই নিহিত। তবে তাঁর সামাজিক অবস্থান, যা প্রায়শই ভ্রাম্যমাণ ও প্রান্তিক, এটাই দেখায় যে এই স্বাধীনতা মূলধারার সমাজের বাইরে অবস্থান করে। মোদ্দাকথা খনার তাৎক্ষণিক ও ব্যবহারিক জ্ঞানের বিপরীতে, ভলভার জ্ঞান পৌরাণিক ও অস্তিত্বমূলক।
উইতে উইভেন ও স্মৃতির পৌরাণিকীকরণ
অন্যদিকে, উত্তর ইউরোপের লোককথায় উইতে উইভেন (Witte Wieven) এক অধিকতর অধরা অবস্থানে অবস্থান করে। উইতে উইভেন জ্ঞানী নারীর প্রতিমূর্তির এমন এক রূপ, যা ধীরে ধীরে সামষ্টিক স্মৃতি ও অতিপ্রাকৃত লোককথার জগতে রূপান্তরিত হয়েছে। এই চরিত্রটি স্বতন্ত্র কোনো ব্যক্তি নন, বরং কুয়াশায় মোড়া, কোনো সমাধিস্থল কিংবা আবাদি জমির প্রান্তে ভাসমান এক অস্তিত্ব। কখনও তিনি বা তাঁরা স্মরণীয় হন চিকিৎসক বা জ্ঞানী নারী হিসেবে, আবার কখনও সতর্ককারী বা বিভ্রান্তকারী আত্মা হিসেবে আবির্ভূত হয়ে। তিনি বা তাঁরা সচরাচর বিন্যস্ত ভবিষ্যদ্বাণীতে কথা বলেন না; বরং তাঁর বা তাদের উপস্থিতিই জ্ঞানের ইঙ্গিত। যেমন পথিককে কখনও পথ দেখায়, কখনও বিভ্রান্ত করে অথবা কুয়াশার আড়ালে তারা ফিসফিসিয়ে সতর্কবার্তা দেয়। অর্থাৎ নৃতাত্ত্বিকভাবে তারা ইঙ্গিত করেন এক রূপান্তরের দিকে, যেখানে একদা সম্মানিত নারীর জ্ঞান ধীরে ধীরে পরিণত হয় কুসংস্কার ও পৌরাণিকতার উপাদানে। যে জ্ঞান একসময় ছিল ব্যবহারিক ও সামাজিক, তা ক্রমে হয়ে ওঠে আধেক ভয়ের, আধেক বিস্মৃতির বিষয়। তবে নারীবাদী নৃতত্ত্বের আলোকে এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিলোপ। যে নারী একসময় সমাজের অংশ ছিলেন, তিনি পরবর্তীতে অস্পষ্ট, প্রেতাত্মাসদৃশ উপস্থিতিতে পরিণত হন। তাঁর কণ্ঠ আর সরাসরি উচ্চারিত হয় না; তা কেবল গল্পের ইঙ্গিতে বা ফিসফিসে ধ্বনিতে টিকে থাকে। ফলে খনার মতো দৈনন্দিন জীবনে স্থিত জ্ঞানের বিপরীতে, উইতে উইভেন প্রান্তিক ও পৌরাণিক স্তরে অবস্থান করে।
শেষ ক’টি কথা বলি। খনা, সিবিল, ভলভা এবং উইতে উইভেন, এই চার চরিত্রের এই স্বল্প পরিসরের তুলনামূলক বিশ্লেষণ দেখায় যে নারী-জ্ঞাতার আদল সর্বত্র বিদ্যমান হলেও তার প্রকাশ ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটে নির্ধারিত। খনার বিশেষত্ব তাঁর জ্ঞানকে গণমুখী করে তোলায়, যেখানে পর্যবেক্ষণ রূপ নেয় সামষ্টিক প্রজ্ঞায় এবং তা দৈনন্দিন জীবনের ছন্দে মিশে যায়। অন্যদিকে সিবিল, ভলভা ও উইতে উইভেন দেখায় ভিন্ন ভিন্ন গতিপথ—দেবীয় মধ্যস্থতা, পৌরাণিক বয়ান এবং লোককথার প্রান্তিকতায় রূপান্তর। ফলে এই চরিত্রগুলো শুধু জ্ঞানের ধারণাকেই নয়, বরং সেই জ্ঞান সৃষ্টিতে ও বিস্তারে নারীর অবস্থানকেও উন্মোচিত করে। খনার উপস্থিতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, কণ্ঠরোধ হলেও ব্যবহারিক প্রজ্ঞার ধ্বনি নিঃশেষ হয় না; তা মাটির সঙ্গে যুক্ত থেকে, স্মৃতির ধারায় বহমান থেকে, প্রয়োজনের তাগিদে চিরজীবী হয়ে থাকে।
তথ্যসূত্র
* Bauman, Richard. Verbal Art as Performance. 1977.
* Ong, Walter J. Orality and Literacy. 1982.
* Spivak, Gayatri Chakravorty. “Can the Subaltern Speak?” 1988.
* Dundes, Alan. Interpreting Folklore. 1980.
* Briggs, Charles L. Learning How to Ask. 1986.
লেখক পরিচিতি
মাহমুদ আলম সৈকত। গদ্যকার ও অনুবাদক। কুমিল্লায় জন্ম, চট্টগ্রাম শহরে বসবাস, ঢাকায় অভিবাসী। বেসরকারি সাহায্য সংস্থায় কর্মরত। উর্দু সাহিত্যে বিশেষ অনুরাগী।
পাঁচটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত। ফয়েজ আহমদ ফয়েজের কবিতা, ইন্তিজার হোসেনের গল্প সংকলন, সাউথ এশিয়ার ছয়টি দেশের গল্পের অনুবাদ সংকলন, তিনা মোদোত্তির শিল্প, জীবন ও রাজনীতি; মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী নারী কবিদের কাব্য সংকলন তার উল্লেখযোগ্য কাজ।