কিরিচের গান
দেখে ফেলা স্বপ্নের দরজায় চাবুকের হিরন্ময় গান ঝুলে থাকে
অমীমাংসার হাওয়া বেয়ে দিগন্তরেখা চলে গেছে রুঢ় অস্তকালে
এইসব মগ্নদিনে ঈশানের আকাশ ছেড়ে কাফনে মোড়ানো এক তানপুরা ধরেছি। নিজস্ব আঙুলে এমন এক সুুর—এমন মাধুর্য
পরিবাহী—এখন খসে পড়া উড়ন্ত পাতাটির হলুদ শিরা বেয়ে নিচে নেমে যেতে পারি আমিও।
নিঃশব্দ পতন বুঝে নেবে নিঃশব্দ পথের ইশারা
একটি সচল ঘোরের রেখা ঘূর্ণিপাক তৈরি করতে করতে গতিশীল যাত্রারাম্ভ করে আর আমি সেই ঘূর্ণায়মান গতির শিকার,
বক্র ও বেগের শিকার, স্থিত আবাহন, সুর ও সুরার শিকার। চোখ চক্রকাল ডুবে আছে শীতে—বরফ নিঃসৃত অনিন্দ্য কিরিচ
কামনায়।
এইসব মায়াপ্রহরের শীতকাল শেষে কিরিচের গান নিয়ে আমি এখন ফিরে যেতে চাই
পারাপার
পাড়ভাঙা পুকুরে বসে পানির কিনার দেখছি।
আমাদের গ্রামের সোয়াসীর জল
সচল প্রবাহে একটানে নিয়ে চলে জলের কিনারায়।
জলের বায়োস্কোপে নির্বাক ছবি আসে
উঁচুনিচু তরঙ্গ ছাড়া জল—সুনিপুণ স্থবির।
জলে কোনো কোনো মুখের ছায়ায় লুকানো আহ্বান—
অথচ কোনোদিন বলেনি, যেতে যেতে অকস্মাৎ ফিরে আসতে পারি।
কতদূর যাবে আর পথ—যতদূর যেতে পারে পাখি
তারা ফিরে যেতে যেতে বিদায়কে মৃত্যু ভেবেছে
আর তার আড়ম্বর অন্ত্যেষ্টি সযত্ন সাজিয়েছে।
আমি সেসব দিনে বিদায়কে ভেবেছি সাঁকো
যেতে যেতে নিশ্চিত পারাপার হবে।
গোলাপসঙ্গম
ফোটার আগে গোলাপ কাঁটাময়—এই রূপকথায় ফুটন্ত ফুলের জীবনী ভালো লাগে। অতিক্রান্ত পথে ক্ষত ক্ষত পুঞ্জীভূত দাগ,
খাঁজে খাঁজে কাঁটা, অথচ লুপ্ত হয় না সবুজ। রক্তের রঙে জীবন মহৎ হয়ে উঠলে নাকে লাগে সুদীর্ঘ ঘ্রাণ। ফুটে ওঠা তখন
ফলাফল, সাফল্যের সমরূপ।
একদিন খাদের ফলায় অসর্তক হৃৎপিণ্ড কেটে গেলে তলার অন্ধকারে সঙ্গমে সমবিন্দু হই। হৃদয় নির্মম সাক্ষী, আঁধার
দেখেছি, দেখেছি আরও বড় অন্ধকার।
পুনরাগমনের দিকে
নিকট সুরের মতো বেজে ওঠে গমন—অধিগমন!
আমার আছে নদীর দিকে ঝোঁক। নদীরা মনের দিকে ফেরে।
জলেরা নদীর দিকে আর আমরা বাড়ির দিকে ফিরি।
জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যে নদী মনের দিকে ফেরে
তার শরীরজুড়ে প্রণয়ের বাঁক, ফেরার সূক্ষ্ম যাতনা থাকে।
আমি যখন বাড়ির দিকে ফিরি, সঙ্গে নিই জলের কলস।
আমাকে যেতে হয় জলপাই বনের ধার দিয়ে। কেননা
আমার শরীরেও আছে অজস্র বাঁক। আর মুদ্রা।
আমি যখন মনের দিকে ফিরি লুকিয়ে রাখি গোপন তাবিজ।
কেননা আমার আছে নদীর দিকে ঝোঁক, ফেরার দিকে ঝোঁক
আর পুনরাগমনের দিকে।
দুই সারি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে হয়—নিকট সুরের মতো।
আক্রান্ত
শরীর ফুঁড়ে যেদিন সুর বেরিয়ে আসল
মানুষ জানল,
অকস্মাৎ আক্রান্ত করতে পারে
এই মোহের বেহালা—
তারপর মানুষ প্রসব করতে থাকবে
একেকটি সজীব
ফাঁদ,
ভায়োলিন—
এবং তারপর
অদৃশ্য হরণ, খয়েরি রক্তপাত
একে অপরের দিকে নিবেদন—
সুর ও সমর্পণ ছুড়ে মারা।
কবি পরিচিতি
নুসরাত নুসিন। জন্ম ২১ নভেম্বর, দিনাজপুরের পার্বতীপুরে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে এমফিল করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
কবিতার বই
★ দীর্ঘ স্বরের অনুপ্রাস, কাগজ প্রকাশন (২০১৭)
★ কামনাফলের দিকে, বৈভব (২০২১)
★ অধর ও আধুলি, বাংলা একাডেমি (২০২৫)
গবেষণাকর্ম
★ রাজশাহীর চলচ্চিত্রের ইতিহাস
★ কাইয়ুম চৌধুরী ও সমরজিৎ রায় চৌধুরীর চিত্রকলায় লোক-ঐতিহ্যের অনুষঙ্গ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ
পুরস্কার
জেমকন তরুণ কবিতা পুরস্কার (২০১৭)
আদম সম্মাননা (২০২২), কলকাতা, ভারত
অনন্যা তরুণ কবিতা পুরস্কার (২০২৪)