হঠাৎ করেই আকাশ মেঘে ঢেকে গেল। চারদিকে আঁধার ছেয়ে এলো। হয়তো আকাশও জানত না আজকের দিনটা কেমন যাবে। মেঘগুলো সকাল থেকেই জমে ছিল, শুধু একটা কারণের অপেক্ষায়। আর কারণটা পেয়ে গেল বিকাল সাড়ে ৪টায়, যখন কাদের সাহেবের বুকটা থেমে গেল- কোনো বাহানা ছাড়া, কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে। মানুষটা সারা জীবন কাউকে কষ্ট দেননি। মরতে গিয়েও দেননি। এভাবেই কেউ কেউ বিদায় নেন। যা মেনে নিতে কষ্ট হয়। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। প্রকৃতির নিয়মের কাছে আবেগ অপেক্ষিত।
রহিম ভ্যানচালক তার বয়স পঞ্চাশের ওপরে। শরীরের হাড় বাইরে থেকে গোনা যায়। তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা যেমন- পিঠে ব্যথা আছে, হাঁটুতে ব্যথা আছে, সংসারে অভাব আছে। তবু প্রতিদিন ভোরবেলা উঠে সে ভ্যান নিয়ে বেরোয়, কারণ সে থামলে সংসার থেমে যাবে। সংসারের হাসি ফোটাতে তার ভিজতে হয়, ব্যথা সহ্য করতে হয় এটিই পুরুষের কাজ। আজও সে বেরিয়েছিল। কাদের সাহেবের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল যখন, তখন বৃষ্টি ভালোমতোই শুরু হয়ে গেছে। উঠানে একটা সাদা কাপড়ে ঢাকা মানুষ পড়ে আছে। চারপাশে দশ-বারোজন লোক- ছাতা মাথায়, দেয়ালে হেলান দিয়ে, কার্নিশের তলায় দাঁড়িয়ে।
কেউ এগোচ্ছে না। রহিম একবার তাকাল। তারপর নামল ভ্যান থেকে। বৃষ্টির পানি তার পা স্পর্শ করল। কেউ তাকে ডাকেনি। কেউ বলেনি, ‘রহিম ভাই, একটু ধরো।’ সে নিজেই গেল- কারণ এই কাজটা তার, কারণ কাউকে না কাউকে যেতে হবে, কারণ মরা মানুষকে এভাবে ফেলে রাখা যায় না বৃষ্টির মধ্যে। মানুষটা বেঁচে থাকতে কতটা মর্যাদা পেয়েছেন জানা নেই- কিন্তু মরার পরেও অন্তত একটুখানি মর্যাদা পাওয়ার অধিকার তার আছে।
কাদের সাহেব একসময় এই গ্রামের আলো ছিলেন। স্কুলের মাস্টার, গ্রামে লাইব্রেরি করেছেন। তার সম্মান তার পরিবার দিতে পারেনি কোনোদিন।
মানুষ ঝগড়া করলে তার কাছে আসত। বিপদে পড়লে তার দরজায় কড়া নাড়ত। রাত ৩টায় কেউ ফোন করলেও তিনি ধরতেন- ঘুমচোখে, বিরক্তি লুকিয়ে বলতেন, ‘বলো, কী হয়েছে?’ দুই ছেলেকে মানুষ করেছেন নিজে না খেয়ে। মানুষ না কি অমানুষ হয়েছে আজ তা নিজ চোখে সে দেখেছে।
বড় ছেলে শাওন যখন প্রথম চাকরি পেল, কাদের সাহেব সেদিন আনন্দে কেঁদেছিলেন- কাউকে দেখাননি, অতি গোপনে। সেই কান্নায় ছিল বাবার সারা জীবনের পরিশ্রম, না খাওয়া, না ঘুমানো, স্বপ্ন দেখা। সেই বাবা এখন বৃষ্টিতে ভিজছেন। চিৎ হয়ে।
আর সেই ছেলে- শাওন, কার্নিশের তলায় দাঁড়িয়ে ফোনে ভিডিও করছে। ফ্রেমে রহিম একা বাবাকে তুলছে, আর বৃষ্টি পড়ছে বাবার মুখের ওপর।
শাওন হয়তো বুঝতে পারছে না সে কী করছে। হয়তো শোকটা এখনও মাথায় পৌঁছায়নি, বুকের কাছে আটকে আছে, কোথাও একটা ব্লক হয়ে গেছে। হয়তো ফোন তোলাটা তার কাছে একটা আশ্রয়- এই মুহূর্তে কী করব বুঝতে না পেরে হাত চলে গেছে পকেটে।
কিন্তু বাবার শরীরে বৃষ্টি পড়ছে। আর ছেলে ভিজছে না। এটুকুই। রহিম একা কুঁজো হয়ে লাশ তুলল।
পিঠের মাংসে আগুন জ্বলে উঠল। হাঁটু কাঁপছে। বৃষ্টির পানি চোখে ঢুকছে। সে চোখ মুছল হাতের উল্টো পিঠে, তারপর আবার ধরল। একা। একটা মানুষের সারা জীবনের ভার, তার স্বপ্ন, তার ভালোবাসা, তার না বলা কথাগুলো, সব নিয়ে রহিম উঠল। ভ্যানে তুলল। সাদা কাপড়টা একটু সরে গিয়েছিল। রহিম সেটি ঠিক করে দিল, যত্ন করে, আস্তে আস্তে। যেন ঘুমন্ত কাউকে কম্বল গায়ে দিচ্ছে। পাশে দাঁড়ানো জামাল সাহেব একবার এগোতে চেয়েছিলেন।
তার স্ত্রী বললেন, ‘এই বৃষ্টিতে যাবে? তোমার কি কোমরে ব্যথা নেই?’ কিছু কিছু বউ স্বামীকে আজকাল রোবট বানিয়ে রেখেছে। কথার ভয়ে তিনি থেমে গেলেন। প্যারালাইজড রোগীর মতো তার পা অবশ হয়ে গেল। তিনি আর সামনে এগিয়ে আসতে পারলেন না।
কিন্তু সেই মুহূর্তটা তাকে সারা রাত তাড়া করবে। ঘুমাতে পারবেন না। বারবার মনে হবে, এক পা এগোলেই পারতাম। মাত্র এক পা। কাদের সাহেব কতবার তার বাড়িতে এসেছেন, কতবার বিপদে পাশে ছিলেন, সেসব মনে আসবে একে একে, ঠিক যখন ঘুমটা দরকার সবচেয়ে বেশি। স্মৃতি বড় নিষ্ঠুর। সে মাফ করে না। ভ্যান চলতে শুরু করল।
কাদামাখা রাস্তায় চাকা ঘুরছে। বৃষ্টি কমেনি একটুও। রহিমের পুরো শরীর ভেজা, মাথার চুল থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত। জামা গায়ের সঙ্গে লেগে গেছে।
সে একবারও পেছনে তাকাল না। কিন্তু ভ্যান চালাতে চালাতে তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। বৃষ্টির পানি আর চোখের জল দুটি কেউ আলাদা করতে পারবে না।
কাদের সাহেবকে সে চিনত। মানুষটা তাকে কখনো শুধু ‘ভ্যানচালক’ বলে ডাকেননি। বলতেন, ‘রহিম ভাই, একটু বসো, চা খাও।’ শেষবার দেখা হয়েছিল মাসতিনেক আগে।
কাদের সাহেব বলেছিলেন, ‘রহিম ভাই, শরীর ঠিক রেখো। তুমি না থাকলে এই পাড়া চলবে না।’
সেই কথাটা এখন বুকের ভেতরে একটা কাঁটার মতো বিঁধছে। রহিম ঠোঁট কামড়ে ধরল। বৃষ্টি সেদিন অনেকক্ষণ পড়েছিল।
উঠানের মাটি ধুয়ে গেল। যেখানে কাদের সাহেব পড়েছিলেন, সেখানে এখন শুধু পানি, কোনো চিহ্ন নেই, কোনো দাগ নেই। যেন কিছুই হয়নি। যেন একটা মানুষ ছিল, আর নেই, পৃথিবী সেটি মনে রাখার প্রয়োজন মনে করেনি। সেই রাতে শাওন একা ঘরে বসে ভিডিওটা দেখল। তিরিশ সেকেন্ড।
ফ্রেমে বৃষ্টি। ফ্রেমে বাবার সাদা কাপড়। ফ্রেমে রহিম- একা, কুঁজো হয়ে, ভিজতে ভিজতে তুলছে। আর ফ্রেমের বাইরে, সে নিজে। শুকনো। ছাতার তলায়।
ভিডিওটা ডিলিট করতে গিয়ে হাতটা থামল। কারণ ডিলিট করলেই কি দৃশ্যটা মুছবে? যে বাবা সারা রাত জেগে তার জ্বরের কপালে হাত রেখেছেন, যে বাবা নিজে ছেঁড়া জুতো পরে তাকে নতুন জুতো কিনে দিয়েছেন, সেই বাবাকে শেষবার একটু ছুঁয়েও দেয়নি সে। বৃষ্টিতে ভেজেনি। ভিডিওটা ডিলিট হলো।
কিন্তু সেই দৃশ্য, রহিমের একা একা কুঁজো হওয়া, বাবার সাদা কাপড়ে বৃষ্টির ফোঁটা, সেটি আর কোনোদিন মুছবে না। সারা জীবন বহন করতে হবে। একা। কখনো কখনো মনে হয় সেই প্রকৃত সুখী যার আপন কেউ নেই। পৃথিবীটা হয়তো এমনই। বাঁচতে বাঁচতে আমরা ভুলে যাই, একদিন আমাদেরও কেউ ছবি অথবা ভিডিও তুলবে। হয়তো একা। হয়তো বৃষ্টিতে। সেদিন কে ভিজবে আমাদের জন্য?
সেই প্রশ্নের উত্তর লেখা হয় আজকের দিনগুলোতে, প্রতিটা মুহূর্তে, যখন এগিয়ে যাওয়া যায় কিন্তু আমরা দাঁড়িয়ে থাকি। যখন বৃষ্টিতে ভেজা যায় কিন্তু আমরা ছাতা ধরি না। অহংবোধ মানুষের ভেতরে ঢুকে গেলে, ঘুণপোকার মতো খেয়ে শেষ করে দেয়।
রহিম সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে ভাত খেতে বসেছিল, তার গলা দিয়ে ভাত নামেনি। সে ঘুমোতে পারেনি। কারণ সে জানে- মানুষটা ভালো ছিলেন। আর ভালো মানুষের এভাবে যাওয়া উচিত না। কিন্তু পৃথিবী ‘উচিত’ মানে না। সে শুধু বৃষ্টি দেয়। আর দেখে- কে ভেজে, আর কে ছবি তোলে। আমরা ডুবে যাচ্ছি অসুস্থ একটি আধুনিক পরিবেশে, মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপে।
সময়ের আলো/জেডআই