বরিশালের কাশিপুর এলাকায় প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন বাস টার্মিনাল তিন বছরেও চালু হয়নি। ৬ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই টার্মিনালের ১১৩টি কাউন্টার আজও খোলা অপেক্ষার মতো ফাঁকা পড়ে আছে। তিন পর্যায়ে নির্মিত এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের ১৫ জুলাই। নগরীর যানজট নিরসনের লক্ষ্যেই কাশিপুরে ট্রাক টার্মিনাল এলাকায় এই বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এখনো তা যাত্রী বা বাস কারও পদচারণা পায়নি।
অন্যদিকে, নগরের নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে। পলেস্তারা খসে পড়ছে, অথচ পদ্মা সেতু চালুর পর বাসের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় সেখানে প্রতিদিন তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। আগে যেখানে দিনে-রাতে প্রায় ১২ হাজার যানবাহন চলাচল করত, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২ হাজারে। ধারণক্ষমতা যেখানে ২০০ বাস, সেখানে বর্তমানে অবস্থান করছে প্রায় ৫০০ বাস।
বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে ৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা এবং অপর দুটি প্রকল্প থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়েছে। যাত্রী সুবিধার জন্য অত্যাধুনিক ওয়েটিং রুম, বিপরীতমুখী প্রবেশ ও বাহির পথসহ নানা অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়। প্রতিদিন অন্তত দেড় হাজার দূরপাল্লার বাস চলাচলের পরিকল্পনাও ছিল।
বিসিসির নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল বারী বলেন, টার্মিনালের কাজ প্রায় শেষ। নথুল্লাবাদে লোকাল ও দূরপাল্লার বাস একসাথে থাকায় যানজট হয়। নতুন টার্মিনাল প্রস্তুত রয়েছে, বাস মালিকরা চাইলে ৭ দিনের মধ্যে হস্তান্তর করা সম্ভব।
তিনি আরও জানান, প্রকল্পটি শুরু করা মেয়র পরবর্তীতে নির্বাচনে পরাজিত হওয়ায় কাজের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, নথুল্লাবাদ টার্মিনালটি উপযুক্ত নয়। বাসগুলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করে। নতুন টার্মিনাল চালু হলে এ সমস্যার সমাধান হবে।
তবে বাস মালিক গ্রুপের অবস্থান ভিন্ন। নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি মো. মোশারেফ হোসেন বলেন, এটি মূলত ট্রাক টার্মিনালের জায়গা। এখানে বাস নিলে ট্রাকের সঙ্গে বিরোধ হবে। আর টার্মিনালের কাজ শেষ করতে আরও দুই বছর লাগবে।
একই মত প্রকাশ করে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, এই টার্মিনাল বাস চলাচলের উপযুক্ত নয়। মাঝখানে গভীর, বর্ষায় হাঁটুসমান পানি থাকে। এখানে বাস পার্কিং অসম্ভব। নির্মাণের নামে টাকা লুটপাট হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নির্মিত ১১৩টি স্টলের অধিকাংশই অরক্ষিত। অনেক শাটার খুলে নেওয়া হয়েছে। টার্মিনাল ভবনে দুই ওয়ার্ড কাউন্সিলরের স্থায়ী অফিস গড়ে উঠেছে। আরসিসি ইয়ার্ড প্রায় অনুপস্থিত, চারপাশ জঙ্গলাকীর্ণ। যাত্রী ছাউনি ও বিশ্রামাগার কার্যত নেই, ছাদ পড়ে আছে নিঃসঙ্গ।
বিসিসি সূত্রে জানা যায়, ভবন, বাউন্ডারি দেয়াল ও আরসিসি ইয়ার্ডে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এছাড়া ১১৩টি স্টলসহ আনুষঙ্গিক কাজে বরাদ্দ ৪ কোটি ৪২ লাখ টাকার মধ্যে ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। কিন্তু কার্যকর কোনো সেবা চালু হয়নি। সন্ধ্যা নামলেই এলাকা মাদকসেবীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
বাসচালক সবুজ বলেন, আমাদের বিশ্রামের জায়গা নেই, রাস্তায় গাড়ি রাখতে হয়। আমরা যেন রাস্তায় থাকা মানুষ।
চালক আলমগীর বলেন, স্থায়ী টার্মিনাল না থাকায় আমরা ভাসমান। নতুন টার্মিনাল চালু হলে উপকার হবে।
বর্তমানে বরিশালে নথুল্লাবাদ ও রূপাতলী এলাকায় দুটি বাস টার্মিনাল রয়েছে, যেখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩৬শ বাস চলাচল করে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কোটি টাকার এই অবকাঠামো দীর্ঘদিন অচলই পড়ে থাকবে।