নদী হারানো জনপদ চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় মৃতপ্রায় গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) ক্যানেলের বুকে অনুষ্ঠিত হলো ব্যতিক্রমী এক সাঁতার প্রতিযোগিতা। নদীমাতৃক বাংলাদেশের হারানো জলঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দিতে ও নতুন প্রজন্মের মাঝে নদীর প্রতি সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতা এক উৎসবে রূপ নেয়।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) আলমডাঙ্গা নাগরিক উন্নয়ন কমিটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ তুমুল প্রতিযোগিতায় দুইটি গ্রুপে অংশ নেন প্রায় অর্ধশত জন সাঁতারু। স্থানীয়দের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও বিপুল দর্শক সমাগমে মুখর হয়ে ওঠে জিকে ক্যানেলের দুই পাড়। নদীমাতৃক দেশের হারিয়ে যাওয়া বাংলার অন্যতম ঐতিহ্য সাঁতারকে এলাকায় আবারও পুনরুজ্জীবিত করলো আলমডাঙ্গা নাগরিক উন্নয়ন কমিটি। প্রতিযোগিতার পুরো সময়জুড়ে ক্যানেলের দুইপাড়ে শত শত উৎফুল্ল নারী-পুরুষ প্রতিযোগিতা প্রত্যক্ষ করেন।
গত কদিন ধরে ব্যাপক প্রচারণায় সাঁতার প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে আলমডাঙ্গার মানুষের মাঝে হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ার আনন্দ লক্ষ্য করা যায়। এতে আলমডাঙ্গা নাগরিক উন্নয়ন কমিটির নামের সার্থকতা খুঁজে পান মানুষ।
প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আগ্রহীদের জন্য অনলাইন ও অফলাইন রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ রাখা হয়। প্রতিযোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে গঠন করা হয় ফায়ার সার্ভিসের রেসকিউ ও মেডিকেল টিম, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয় ক্যানেলের নির্ধারিত অংশ। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আলমডাঙ্গা নাগরিক উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল্লাহ আল মামুন।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. মাসুদ পারভেজ রাসেল। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ছেলে-মেয়েদের খেলাধুলার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হচ্ছে আমাদের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের। বিশেষ করে যারা স্কুলে পড়ে তাদের হাতে আমরা স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছি যার ফলে তারা বিভিন্ন গেমস এবং এপসে আসক্ত হয়ে পড়ছে।
আলমডাঙ্গা নাগরিক উন্নয়ন কমিটি থেকে সাঁতার প্রতিযোগিতার যে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে এটি যদি আমরা প্রত্যেকটি জেলা, উপজেলাসহ সারা দেশে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কমিটির মাধ্যমে করতে পারি তাহলে আমাদের ছেলে মেয়েদের জন্য একটি দারুণ ভবিষ্যৎ আমরা তৈরি করতে পারব।
আলমডাঙ্গা নাগরিক উন্নয়ন কমিটিকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, সাঁতার প্রতিযোগিতার আজকের যে প্রশংসনীয় আয়োজন এতে অনেকেই অনুপ্রাণিত হবে। আমরা মনে করি এটা এ অঞ্চলে ২য় বারের মত আয়োজন হচ্ছে। সাঁতারসহ নিয়মিত অন্যান্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করলে ছেলেমেয়েদের মোবাইল আসক্তি কমে যাবে। ছেলেরা মাদক দ্রব্যের দিকে অগ্রসর হবে না।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারি কমিশনার আব্দুল্লাহ আল শামীম, নাগরিক উন্নয়ন কমিটির সহসভাপতি সাংবাদিক রহমান মুকুল, বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি মকবুল হোসেন, জেলা জামায়াতের যুব বিষয়ক সম্পাদক নুর মোহাম্মদ হোসাইন টিপু, উপজেলা জামায়াতের আমীর সফিউল আলম বকুল, নাগরিক উন্নয়ন কমিটির সহসভাপতি মীর আসাদুজ্জামান উজ্জ্বল, মন্ডল স্পোর্টসের স্বত্বাধিকারী মামুন অর রশিদ মন্ডল।
সাঁতার প্রতিযোগিতার প্রধান পরিচালক ইসলাম রকিব, সহকারি পরিচালক মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকসহ ১০ জন।
স্বাগত বক্তব্যে নাগরিক উন্নয়ন কমিটির সহসভাপতি সাংবাদিক রহমান মুকুল বলেন, এই আয়োজন কেবল খেলাধুলা নয়, বরং এটি নদী-জলাধার রক্ষার এক প্রতীকী প্রতিবাদ ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতা তৈরির মাধ্যম। নদীই এ দেশের কৃষি, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মূল উৎস। নদীর প্রবাহহীনতায় একদিকে যেমন মরুকরণ শুরু হয়েছে, তেমনি হারাচ্ছে জীববৈচিত্র্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। তাই নদীকে হত্যা করা মানে নিজের অস্তিত্বকে ধ্বংস করা।
নদী-বিল-খাল হারা জনপদে, যেখানে জলের স্মৃতি কেবল গল্প হয়ে থাকে, সেখানে এ আয়োজন যেন হারানো নদীর জলে জেগে ওঠা আশার আলো। এটি শুধু ক্রীড়ানুষ্ঠান নয়, বরং নদীর শোকগাথায় জীবনের জয়গান। এ মন্তব্য অনেকের।