বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হলো জনশক্তি রফতানি। জনশক্তি দেশে শুধু রেমিট্যান্স আনে না, দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করে! তবে এই খাতে বর্তমানে যে দুর্বলতা ও চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে, তা দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দক্ষ শ্রমিক তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই খাতের উন্নয়ন করতে হবে, অন্যথায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- ভুয়া নথি ও অবিশ্বস্ত এজেন্টের মাধ্যমে ইউরোপের ভিসা পেতে বাংলাদেশি শ্রমিকরা ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে- ভিসা, পারমিট ও অন্যান্য কনস্যুলার সেবা নিতে অননুমোদিত ও জালিয়াতিমূলক পদ্ধতি ব্যবহার করলে বড় ধরনের আর্থিক ও আইনি ঝুঁকি থাকে। ফলে ভিসা ও বৈধতা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হচ্ছে, যা সরাসরি জনশক্তি রফতানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশেই এখন অদক্ষ কর্মী নেওয়া প্রায় বন্ধ। বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, লেবানন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে জনশক্তি রফতানি কমে গেছে বা বন্ধ হয়ে গেছে। এর মূল কারণ হলো, দক্ষতা ছাড়া কর্মী নেওয়া হয় না এবং অনেক বাংলাদেশি অবৈধভাবে অবস্থান করছে। ফলে বাংলাদেশি শ্রমিকরা হয়রানি ও বৈধতা সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ছেন। বিশেষ করে সৌদি আরবের মতো বড় শ্রমবাজারে নির্দিষ্ট দক্ষতা ও সার্টিফিকেটের প্রয়োজন, যা বাংলাদেশে এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
ইউরোপে বাংলাদেশিরা ভিসা ও পাসপোর্টে জালিয়াতির আশ্রয় নিচ্ছে। এর ফলে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সতর্কতা জারি করেছে। এতে বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, কারণ এই ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে বৈধ প্রবেশ ও কাজের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। একই সঙ্গে ইউরোপের কিছু দেশে ভিসা নিষেধাজ্ঞার কারণে অদক্ষ ও অবৈধ কর্মীর সংখ্যা আরও বাড়ছে।
অন্যদিকে জাপান ও মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সম্ভাবনা থাকলেও ভাষা ও দক্ষতার অভাব বড় বাধা। তবে জাপানে ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে এই সমস্যা দূর করার জন্য কাজ চলছে। মালয়েশিয়া ও রাশিয়ায় কিছুটা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তবে সেগুলোর জন্য দক্ষতা ও সততা প্রয়োজন।
শ্রমবাজারের এই দুর্বলতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলকে আরও শক্তিশালী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। কারিগরি শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে সংযুক্ত করে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ভিসা ও বৈধতার প্রক্রিয়া সহজতর করতে হবে। অন্যথায় বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের শ্রমবাজার পড়ে যাবে বড় ধরনের ধসের মুখে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে।
জনশক্তি রফতানি শুধু সংখ্যা বাড়ানোর বিষয় নয়, এটি দক্ষ ও যোগ্য কর্মীর মাধ্যমে সুসংহত ও টেকসই করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি, বেসরকারি ও শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগ। তা হলেই বাংলাদেশ বিশ্ব শ্রমবাজারে নিজেদের মর্যাদা বজায় রাখতে পারবে এবং অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
এ বিষয়ে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, বর্তমান সরকারের ইশতেহারে অভিবাসন নিয়ে বেশ কয়েকটা প্যারাগ্রাফ রয়েছে, যা ইতিবাচক। এর একটি ভালো দিক হচ্ছে যে দক্ষ কর্মী গড়া। কিন্তু দক্ষ কর্মী গড়া শুধু একটি প্ল্যাটফর্মের বিষয় না। এখানে মাল্টি লেভেলের স্টেকহোল্ডার রয়েছে, যাদের সবার সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
বর্তমান বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে শ্রমবাজার বিষয়টি আমাদের জন্য একটি উদ্বেগের কারণ। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের কারণে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তবে এ ক্ষেত্রে জনশক্তি বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ীরা এ বাজারে কর্মী পাঠানো নিয়ে সিন্ডিকেট বাণিজ্যের যে শঙ্কার কথা বলছেন তা দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। দক্ষ কর্মী নিয়োগ বেশি করে তৈরিতে নজর দিতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্টরা এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।
সময়ের আলো/আআ