১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আক্রমণের নির্দেশ দেন। সে সময় তার ধারণা ছিল, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তেহরান দখল করা সম্ভব হবে। কিন্তু বাস্তবে সেই সংঘাত দীর্ঘ আট বছর স্থায়ী হয় এবং এতে প্রাণ হারায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ। চার দশক পর বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধই মূলত বর্তমানের ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
যুদ্ধ একটি রহমত
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব-পরবর্তী অস্থির সময়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনির জন্য এই যুদ্ধ এক ধরনের রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। সে সময় তার একটি বহুল প্রচারিত উক্তি ছিল, ‘যুদ্ধ একটি রহমত।’
প্যারিসভিত্তিক ইরানি বিরোধী নেতা বেহরুজ ফারাহানির মতে, একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্য যুদ্ধ ভিন্নমত দমনের একটি কার্যকর উপায়। এই যুদ্ধের আড়ালে খোমেনি বামপন্থী, জাতীয়তাবাদী ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক শক্তিকে দমন করে কট্টরপন্থী আলেমদের নেতৃত্বে শাসনব্যবস্থাকে সুসংহত করেন।
যুদ্ধ থেকে উঠে আসা নেতৃত্ব
বর্তমান ইরানের রাজনীতি ও সামরিক নেতৃত্বের বড় অংশই ওই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুদ্ধে অংশ নেওয়া কাসেম সোলেইমানি পরবর্তীতে আইআরজিসি’র কুদস ফোর্সের প্রধান হন। তার মৃত্যুর পর এ দায়িত্বে আসেন ইসমাইল কানি।
একইভাবে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কূটনীতিতে আসার আগে আইআরজিসি’র সদস্য ছিলেন। এছাড়া পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উঠে এসে প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
আত্মনির্ভরতা ও ভূগর্ভস্থ সমরকৌশল
যুদ্ধের শুরুতে ইরান আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। পশ্চিমা বিশ্ব ও অধিকাংশ আরব দেশ ইরাককে সমর্থন দেয়।
ইতিহাসবিদ মজিয়ার বেহরুজের মতে, তখনই ইরান উপলব্ধি করে বাইরের সাহায্যের ওপর নির্ভর করা যাবে না। এই অভিজ্ঞতা থেকেই দেশটি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করে। পাশাপাশি বিমান হামলা এড়াতে সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ভূগর্ভে স্থানান্তরের কৌশল গ্রহণ করে, যা আজও তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় শক্তি।
সামরিক ভ্রাতৃত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি
ইতিহাসবিদ পেয়মান জাফরির মতে, আট বছরের যুদ্ধ আইআরজিসি কমান্ডারদের মধ্যে দৃঢ় পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। যুদ্ধ শেষে তারা শুধু সেনাবাহিনীতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং রাজনীতি, অর্থনীতি ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হন।
এর ফলে ইরানের শাসন কাঠামো বহুমাত্রিক ও সুসংগঠিত হয়ে ওঠে, যা বহিরাগত চাপ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অমীমাংসিত অভ্যন্তরীণ সংকট
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ ইরানকে বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে শক্তিশালী করলেও অভ্যন্তরীণ সংকট দূর করতে পারেনি। দমন-পীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা হলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে জনগণের একটি বড় অংশ বর্তমান ব্যবস্থার প্রতি অসন্তুষ্ট।
বিশ্লেষকদের মতে, সাদ্দাম হোসেনের আক্রমণ ইরানকে ধ্বংস করতে না পারলেও একে একটি শক্তিশালী সামরিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার পুরনো ‘যুদ্ধের আশীর্বাদ’ তত্ত্ব দিয়ে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ কতটা সামাল দিতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে।