সৃষ্টির কিছুই তুচ্ছ নয়। প্রতিটি প্রাণীই আল্লাহর অসীম জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কুদরতের একেকটি নিদর্শন। ক্ষুদ্রতম সৃষ্টির মধ্যেও যে সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা, শৃঙ্খলা ও প্রজ্ঞার ছাপ রয়েছে, তা উপলব্ধি করলে মানুষের অন্তরে স্রষ্টার প্রতি শ্রদ্ধা, বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতা আরও গভীর হয়।
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর অসংখ্য সৃষ্টির মধ্যে ক্ষুদ্রতম প্রাণীদের কথাও উল্লেখ করেছেন। মশা, মাকড়সা, মৌমাছি ও পিঁপড়ার মতো ক্ষুদ্র প্রাণী উল্লেখ করার মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে আত্মচিন্তা করতে, বিনয়ী হতে এবং সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টার মহিমা অনুধাবন করতে শিক্ষা দিয়েছেন।
কুরআনের ১৬তম সুরার নাম রাখা হয়েছে ‘আন-নাহল’ অর্থাৎ মৌমাছি। এই সুরার ৬৮ ও ৬৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমার রব মৌমাছিকে ইঙ্গিতে জানিয়েছে যে, তোমরা পাহাড়ে ও গাছে এবং মানুষের গৃহে তোমাদের নিবাস বানাও। অতঃপর তুমি প্রত্যেক ফল থেকে আহার করো এবং তুমি তোমার রবের সহজ পথে চলো। তার পেট থেকে এমন পানীয় বের হয় যার রং ভিন্ন ভিন্ন, যাতে রয়েছে মানুষের জন্য রোগ নিরাময়। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।’ এখানে ‘অহি’ শব্দটির ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তাফসির অনুযায়ী এই ‘অহি’ হলো সেই সহজাত প্রেরণা যা আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে দেন– যেভাবে সদ্যোজাত শিশু দুধ পান করতে শেখে, পাখি উড়তে শেখে ও মাছ সাঁতার কাটতে শেখে। একটি মৌমাছি কোনো শিক্ষা না পেয়েও পরিপূর্ণ ষড়ভুজ কোষ তৈরি করে, এটি কার শেখানো? এই প্রশ্নের উত্তর কুরআন পনেরোশ বছর আগেই দিয়ে রেখেছে।
কুরআনের ২৯তম সুরার নাম ‘ধাল-আনকাবুত’ অর্থাৎ মাকড়সা। এর ৪১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা আল্লাহ ছাড়া বহু অভিভাবক গ্রহণ করে, তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার ন্যায়, যে ঘর বানায় এবং নিশ্চয় সবচেয়ে দুর্বল ঘর হলো মাকড়সার ঘর, যদি তারা জানত।’
তাফসিরে বলা হয়েছে, যেভাবে মাকড়সার জাল একটি আঙুলের সামান্য স্পর্শেই ভেঙে পড়ে, তেমনি আল্লাহর বিপরীতে দাঁড় করানো যেকোনো আশ্রয়ের স্তম্ভও আল্লাহর পরিকল্পনার সামনে ধুলোয় মিশে যায়। এখানে একটি ক্ষুদ্র প্রাণীর স্থাপত্য থেকে নেওয়া হয়েছে মহাজীবনের সবচেয়ে গভীর দার্শনিক শিক্ষা। পনেরোশ বছর আগে যখন কুরআন মাকড়সার জালকে দুর্বলতার উদাহরণ হিসেবে দিল, তখন মানুষ জানত না যে সেই একই জাল একদিন বিজ্ঞানের কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিক তন্তুর মর্যাদা পাবে।
কুরআন এখানে বৈজ্ঞানিক দাবি করেনি, দার্শনিক সত্য বলেছে। আর সেই সত্যের গভীরতা যুগ থেকে যুগে নতুন অর্থ নিয়ে উন্মোচিত হচ্ছে।
কুরআনের ২৭তম সুরার নাম ‘আন-নামল’ অর্থাৎ পিঁপড়া। এই সুরায় বর্ণিত হয়েছে এমন এক অসাধারণ মুহূর্ত– সুলায়মান (আ.)-এর বিশাল বাহিনী এগিয়ে আসছে আর একটি পিঁপড়া তার গোষ্ঠীকে সতর্ক করে দিচ্ছে, ‘অবশেষে যখন তারা পিঁপড়ার উপত্যকায় পৌঁছল তখন এক পিপড়া বলল, ওহে পিঁপড়ার দল, তোমরা তোমাদের বাসস্থানে প্রবেশ করো। সুলায়মান ও তার বাহিনী তোমাদের যেন অজ্ঞাতসারে পিষ্ট করে মারতে না পারে’ (সুরা নামল : ১৮)।
হজরত সুলায়মান (আ.) সেই কথা শুনে থমকে দাঁড়ালেন, মুগ্ধ হলেন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। এই আয়াতে একটি পিঁপড়াকে এমনভাবে চিত্রিত করা হয়েছে যে পিঁপড়াটি নিজের দলের কথা ভাবছে, পরিস্থিতি বুঝছে ও সতর্কবার্তা দিচ্ছে। এটি কেবল কাহিনি নয়– সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহ প্রদত্ত বোধশক্তির নিদর্শনও।
সুরা বাকারার ২৬তম আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ মাছি কিংবা তার চেয়েও ছোট কিছুর উপমা দিতে লজ্জা করেন না। সুতরাং যারা ঈমান এনেছে তারা জানে, নিশ্চয় তা তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য। আর যারা কুফরি করেছে তারা বলে, আল্লাহ এর মাধ্যমে উপমা দিয়ে কী চেয়েছেন? তিনি এ দিয়ে অনেককে পথভ্রষ্ট করেন এবং এ দিয়ে অনেককে হেদায়েত দেন। আর এর মাধ্যমে কেবল ফাসিকদেরই পথভ্রষ্ট করেন।’ এই আয়াতের মধ্যে একটি গভীর মানবিক সত্য আছে। মানুষ যা তুচ্ছ মনে করে, আল্লাহ সেটিকেই উদাহরণ হিসেবে বেছে নেন। অহংকারী মন বলে, এত ছোট জিনিস নিয়ে কথা বলার কী আছে? আর বিনয়ী মন বলে, এই ছোট জিনিসেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় সত্য।
এই আয়াতগুলোর পাশাপাশি হাদিসেও ক্ষুদ্র সৃষ্টির প্রতি অসাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মধু সম্পর্কে বলেছেন, ‘পেটের রোগে মধু সেবন করো।’
আবু সাঈদ (রা.) হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবীজি (সা.)-এর কাছে এসে বলল, আমার ভাইয়ের পেটে অসুখ হয়েছে। তখন নবী (সা.) বললেন, তাকে মধু পান করাও। এরপর লোকটি দ্বিতীয়বার এলে তিনি বললেন, তাকে মধু পান করাও। অতঃপর তৃতীয়বার এলে তিনি বললেন তাকে মধু পান করাও। এরপর লোকটি এসে বলল, আমি অনুরূপই করেছি। তখন নবী (সা.) বললেন, আল্লাহ সত্য বলেছেন, কিন্তু তোমার ভাইয়ের পেট মিথ্যা বলছে। তাকে মধু পান করাও। অতঃপর সে তাকে পান করাল। এবার সে রোগমুক্ত হলো (সহিহ বুখারি : ৫৬৮৪)। আজ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান নিশ্চিত করেছে মধুর অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণ, ক্ষত নিরাময়ের ক্ষমতা এবং রোগ প্রতিরোধশক্তি বাড়ানোর সামর্থ্য।
সুরা নাহলের সামগ্রিক বার্তা হলো এই যে, মহাবিশ্বের সবকিছুই (সমুদ্র, তারা, পাহাড় এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মৌমাছিও) আল্লাহর অসীম শক্তির নিদর্শন। কুরআন মানুষের চিন্তা ও দৃষ্টিকে এমনভাবে গড়ে তোলে, যাতে মানুষ প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে সত্যকে অনুধাবন করতে পারে।
মৌমাছির ঘরে আল্লাহর অহি, পিঁপড়ার সতর্কবার্তায় নবীর কৃতজ্ঞতা, মাকড়সার জালে মহাজীবনের দর্শন এবং মশার মধ্যে ঈমান ও অহংকারের পরীক্ষার মাধ্যমে কুরআন মানুষকে জানিয়ে দেয়– মহত্ত্ব কখনো আকারে নির্ধারিত হয় না; বরং তা প্রকাশ পায় অর্থ, শিক্ষা ও প্রজ্ঞার গভীরতায়। আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে ছোট বলে কিছু নেই; ক্ষুদ্র প্রাণীর মধ্যেও বড় শিক্ষা নিহিত থাকে, তা উপলব্ধি করতে হলে মনোযোগ, দৃষ্টি ও চিন্তা প্রয়োজন।
লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক, আসাম, ভারত।
এফআর