শস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাওড়ে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ইরি-বোরো ফলন হয়েছে বেশ ভালো। বিগত কয়েক বছর কৃষকরা ভালোভাবে ফসল ঘরে তুলতে পারলেও এ বছর তার ব্যতিক্রম দেখা দিয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে নিচু এলাকায় পানি জমে হাওড়ের অনেক ফসল তলিয়ে গেছে। অনেক জায়গায় ডুবুডুবু অবস্থা। ফলে উঠতি পাকা ফসল কাটতে পারছেন না কৃষকরা।
একমাত্র ফসল ঘরে তুলতে শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের। এর মধ্যেই ভারতের চেরাপুঞ্জিতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আর এই পাহাড়ি ঢলের পানি নামতে শুরু করেছে জেলার নদ-নদীগুলোতে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সমতলেও বেড়েছে পানি। তাই অকালবন্যার শঙ্কায় হাওড়ে জমির পাকা ধান দ্রুত কাটতে মাইকিং করে কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।
এ বিষয়ে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ধনু-বাউলাই নদীর পানি সমতলে বৃদ্ধি পেয়েছে। হাওড়ের জমিতে ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেলে সেগুলো জমিতে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। জেলায় আগেও ভারী বৃষ্টি হয়েছে। এমনিতে বৃষ্টিতে হাওড়ের পানি বেড়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এখন উজানের ঢল নামলে পানি আরও বাড়বে। তাই দ্রুত পাকা ধান কাটতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন।
নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, অতি বৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন হাওড়ে ইরি-বোরো ফসলি জমি জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে কারো হাত নেই। নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম আরও বলেন, যত দ্রুত সম্ভব ফসল কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফসল ঘরে তুলতে পারবেন কৃষকরা।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, এ বছর চৈত্র মাসের শুরু থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আর অতিবৃষ্টিতে বিভিন্ন হাওড়ে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। এ ছাড়া ভারতের চেরাপুঞ্জিতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় ওই পানি নেত্রকোনার সোমেশ্বরী, কংস, ধনু, উদ্ধাখালীসহ অন্যান্য নদ-নদীতে প্রবেশ করছে। ফলে পানি বৃদ্ধি পেয়ে যে কোনো সময় হাওড় এলাকায় দেখা দিতে পারে অকালবন্যা, ক্ষতি হতে পারে বোরা ফসলের।
হাওড় পাড়ের কৃষকরা জানান, এ বছর অতি বৃষ্টির কারণে জমির ফসল তলিয়ে গেছে। বেশিরভাগ জমিতে পানি জমে রয়েছে। ফলে কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটতে সমস্যা হচ্ছে। সংকট রয়েছে ধান কাটার শ্রমিকেরও। হাওড়ে ধান কাটার যন্ত্র চালাতে ডিজেলের সংকট থাকলেও তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি জেলা প্রশাসন। হাওড়ের উঠতি বোরো ফসল নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা। জমিতে জলাবদ্ধতার কারণে চড়া মূল্যে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাতে হচ্ছে।
স্থানীয় অনেক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় হাওড়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ধান কাটতে শ্রমিক আসতো। স্থানীয় শ্রমিকদের নিয়ে হাওড়ের ধান কাটত তারা। কিন্তু বিভিন্ন কারণে ধান কাটা শ্রমিকের সংখ্যা কমে গেছে। এবার জমিতে পানি থাকায় ধান কাটতে অনীহা প্রকাশ করছে শ্রমিকরা। যারা কাটছে তারা অনেক চড়া মূল্য নিচ্ছে। লোকসান হলেও একমাত্র ফসল ঘরে তুলতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা।
নেত্রকোনা কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দাসহ সবকটি উপজেলার সাধারণ মানুষ হাওড়ের একমাত্র ইরি-বোরো ফসলের ওপরই নির্ভর করে। কৃষকদের সারা বছরের সংসার খরচ, চিকিৎসা, সন্তানদের পড়ালেখা ও আচার-অনুষ্ঠান চলে এই আয় দিয়ে।
জেলায় ছোট-বড় মোট ১৩৪টি হাওড়ের মধ্যে খালিয়াজুরীতে ৮৯টি হাওড় রয়েছে। আগাম বন্যা থেকে হাওড়ের ফসল রক্ষায় এ বছর ১৩৮ কিলোমিটার ডুবন্ত (অস্থায়ী) বাঁধ দেওয়া হয়। পাউবো ও উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এসব বাঁধে ব্যয় ধরা হয় ৩১ কোটি টাকা। এসব বাঁধের ওপর স্থানীয় কৃষকদের প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির রোরো ফসল নির্ভর করে।
গত দুই সপ্তাহের বৃষ্টিতে জেলার কংস, উদ্ধাখালী, ধনুসহ বেশ কয়েকটি নদ-নদীর পানি বাড়ছে। এতে করে উঠতি বোরো ফসল নিয়ে চিন্তিত স্থানীয় কৃষক। নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলের প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদিত ফসলের বাজারমূল্য প্রায় ৭০০ কোটি টাকা।
/কেএইচও