চলতি বছরে বিশ্বের ছয়টি বড় জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির বিপুল মুনাফা নিয়ে একটি বিশ্লেষণ সামনে এসেছে, যেখানে বলা হয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন বেড়ে চলেছে, তখন এই কোম্পানিগুলো অভাবনীয় আয়ের মুখ দেখছে।
অক্সফ্যাম ইন্টারন্যাশনালের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে শেভরন, শেল, বিপি, কনোকোফিলিপস, এক্সন এবং টোটালএনার্জিস—এই ছয়টি কোম্পানি সম্মিলিতভাবে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২,৯৬৭ ডলার মুনাফা করবে। এতে গত বছরের তুলনায় তাদের দৈনিক আয় আরও প্রায় ৩৭ মিলিয়ন ডলার বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মোট মিলিয়ে বছরে এই কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত লাভ প্রায় ৯৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, বর্তমান সময়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালিতে বিধিনিষেধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে গেছে। মার্চ মাসে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি ছাড়িয়ে যায়। এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে কোম্পানিগুলো অতিরিক্ত লাভ করছে বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে।
অক্সফ্যামের জলবায়ু নীতি বিষয়ক প্রধান মারিয়ানা পাওলির মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক বৈষম্য এই কোম্পানিগুলোর জন্য বাড়তি মুনাফার সুযোগ তৈরি করছে। তার ভাষায়, বাজারে অস্থিরতার কারণে তেলের দাম বাড়ছে, আর সেই বাড়তি দামের সরাসরি সুবিধা পাচ্ছে বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলো।
এই অবস্থার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ এবং দৈনন্দিন ব্যয়ের চাপ বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই আর্থিক সংকটে পড়ছেন। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসের দাম গড়ে ৪ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যা আবাসন ও খাদ্যপণ্যের উচ্চ মূল্যের সঙ্গে মিলিয়ে মানুষের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশ, যারা জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও কোথাও কাজের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনে ঘরে থেকে কাজ করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, আবার কিছু দেশে সপ্তাহে চার দিন কাজের মতো পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এমনকি কিছু জায়গায় জ্বালানি রেশনিং এবং হাসপাতালগুলোতে সরঞ্জামের ঘাটতির মতো সমস্যাও দেখা দিয়েছে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংঘাতগুলো তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর জন্য অতিরিক্ত লাভের সুযোগ তৈরি করেছে। একটি অন্য বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২২ সালের পরবর্তী চার বছরে এই খাতের বড় কোম্পানিগুলো প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে।
এছাড়া সাম্প্রতিক আরেকটি যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, ইরান-সম্পর্কিত উত্তেজনার প্রথম মাসেই শীর্ষ ১০০ তেল ও গ্যাস কোম্পানি প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করেছে, অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে কয়েক হাজার ডলারের মুনাফা হয়েছে।
তবে এত বিপুল লাভ সত্ত্বেও অনেক কোম্পানি নবায়নযোগ্য শক্তিতে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না বাড়িয়ে বরং তেল ও গ্যাস উৎপাদনেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বলে সমালোচনা রয়েছে। কিছু কোম্পানি তাদের পূর্বের পরিবেশগত প্রতিশ্রুতিও শিথিল করেছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
যদিও সংশ্লিষ্ট কিছু কোম্পানি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন যে রিপোর্টটি বাজারের বাস্তব পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করেনি। তার মতে, উৎপাদন, পরিবহন ও পরিশোধনের ব্যয়সহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে জ্বালানি শিল্প সবসময়ই ওঠানামার মধ্যে থাকে। তাই ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ ও সরবরাহ বজায় রাখতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়।
/ইউএমএইচ