চাহিদার চেয়ে ১৭ লাখ লিটার বেশি উত্তোলন, জাবিতে পানির অপচয়

হাবিবুর রহমান সাগর, জাবি

শিক্ষা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পানির অপচয় এবং অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের

2026-04-29T17:11:18+00:00
2026-04-29T17:11:18+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
শিক্ষা
চাহিদার চেয়ে ১৭ লাখ লিটার বেশি উত্তোলন, জাবিতে পানির অপচয়
হাবিবুর রহমান সাগর, জাবি
প্রকাশ: বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ৫:১১ পিএম 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। ছবি : সময়ের আলো
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ পানির অপচয় এবং অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয় এমনকি ভূমি অবনমন বা ধসে পড়ার মতো ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে দৈনিক পানির প্রকৃত চাহিদা প্রায় ৩০ লাখ লিটার হলেও উত্তোলন করা হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫০ লাখ লিটার। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১৫ লাখ লিটারেরও বেশি পানি অপচয় হচ্ছে, যা মোট উত্তোলনের প্রায় ৩৫ শতাংশ। এই বিপুল অপচয় শুধু সম্পদের অপব্যবহারই নয়, বরং এটি একটি ক্রমবর্ধমান জল সংকটের পূর্বাভাসও দিচ্ছে।

গবেষণায় উঠে আসা ভয়াবহ চিত্র
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মাজেদা ইসলাম এবং সহযোগী অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান সরকারের পরিচালিত দুটি পৃথক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত সময় ধরে ক্যাম্পাসের পাঁচটি ভূগর্ভস্থ পর্যবেক্ষণ কূপ থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণাটি পরিচালিত হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ক্যাম্পাসের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে প্রায় ২ দশমিক ৩ মিটার বা সাড়ে ৭ ফুট নিচে নেমে গেছে। বিভিন্ন এলাকায় এই পতনের মাত্রা আরও বেশি। উদাহরণস্বরূপ, মীর মশাররফ হোসেন হলে পানির স্তর ২ দশমিক ৭ মিটার, মওলানা ভাসানী হলে ১ দশমিক ৯৭ মিটার, চিকিৎসাকেন্দ্র এলাকায় ২ দশমিক ৬৪ মিটার, বিশমাইল এলাকায় ২ দশমিক ৮০ মিটার এবং ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগ এলাকায় ১ দশমিক ৮৯ মিটার পর্যন্ত নিচে নেমেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই হারে পানির স্তর কমতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে ভূগর্ভস্থ জলাধারের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।

অপচয়ের প্রধান কারণ : লিকেজ ও অব্যবস্থাপনা
গবেষণায় পানির অপচয়ের প্রধান দুটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে-সরবরাহ লাইনের ত্রুটি (সিস্টেম লস) এবং বিভিন্ন আবাসিক হলের পানির ট্যাংক উপচে পড়া। 

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেসিয়াম, বিজ্ঞান কারখানা এবং কেন্দ্রীয় মসজিদসংলগ্ন পানির লাইনে একাধিক স্থানে লিকেজ রয়েছে। অনেক জায়গায় পাইপ ফেটে পানি অবিরামভাবে বের হতে দেখা যায়।

অন্যদিকে, আবাসিক হলগুলোর পানির ট্যাংক উপচে পড়া যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী অনুপ সরকার বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ট্যাংক থেকে পানি উপচে পড়ছে। মনে হয়, পাম্প চালু করে রেখে কেউ আর খেয়াল করে না।

এই ধরনের অব্যবস্থাপনা শুধু পানির অপচয়ই বাড়াচ্ছে না, বরং বিদ্যুৎ খরচও বাড়াচ্ছে এবং অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

পুরোনো পাইপলাইন : সমস্যার মূল শেকড়
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পাসের বেশিরভাগ পানির পাইপলাইন ১৯৭৩ সালে স্থাপিত। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে এসব পাইপের পুরুত্ব কমে গেছে এবং বিভিন্ন স্থানে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপপ্রধান প্রকৌশলী (সিডিল-২) আসাদুজ্জামান বলেন, পাইপগুলো অত্যন্ত পুরোনো হওয়ায় লিকেজ হচ্ছে। এগুলো পরিবর্তন করা প্রয়োজন। ক্যাম্পাসের রাস্তার উন্নয়নকাজ শুরু হলে ধাপে ধাপে পুরোনো পাইপলাইনগুলো বদলে ফেলা হবে।


তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই এই সমস্যার কথা বলা হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সোহেল আহমেদ বলেন, ক্যাম্পাসে মাঝেমধ্যে পানির কল চুরির ঘটনা ঘটে, এতে অপচয় হয়। তবে যে-সব জায়গায় লিকেজ ছিল, তার বেশিরভাগই ইতোমধ্যে মেরামত করা হয়েছে। বাকি সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।

তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে মনে করছেন শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন।

ভূতাত্ত্বিক কারণ : কেন কমছে পানির স্তর?

টিলা নামক একটি আধা-আবদ্ধ বালুময় জলাধার রয়েছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, জাবি ক্যাম্পাসের নিচে ভুপি এর উপরে প্রায় ১০ দশমিক ৩৬ মিটার পুরু ‘মধুপুর কাদা’ স্তর রয়েছে, যা বৃষ্টির পানি সহজে মাটির নিচে প্রবেশ করতে বাধা দেয়।

সহযোগী অধ্যাপক মিজানুর রহমান সরকার বলেন, এই পুরু কাদার কারণে বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে প্রবেশ করতে পারে না। ফলে প্রাকৃতিকভাবে পানির স্তর পুনর্ভরণ হচ্ছে না। অথচ প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের সংকট ডেকে আনতে পারে।

সম্ভাব্য ঝুঁকি : ভূমি অবনমন ও অবকাঠামোগত ক্ষতি।

অধ্যাপক মাজেদা ইসলাম সতর্ক করে বলেন, পানির স্তর দ্রুত নিচে নামতে থাকলে জলাধারের হাইড্রোস্ট্যাটিক চাপ কমে যাবে। এতে ভূমি অবনমন বা সাবসাইডেন্সের ঝুঁকি তৈরি হবে।

ভূমি অবনমন ঘটলে ভবন, রাস্তা এবং অন্যান্য অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি ক্যাম্পাসের স্বায়িত্বও হুমকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন শহরে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে ইতোমধ্যেই ভূমি ধসের ঘটনা ঘটেছে। জাবির ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সমাধানের পথ : কৃত্রিম পুনর্ভরণ ও ব্যবস্থাপনা সংস্কার

এই সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো কৃত্রিম রিচার্জ বা পুনর্ভরণ ব্যবস্থা চালু করা। মিজানুর রহমান সরকার বলেন, ভবনের ছাদ থেকে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে তা পরিশোধন করে পাইপের মাধ্যমে সরাসরি ভূগর্ভে পাঠানো গেলে পানির স্তর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এছাড়া, ক্যাম্পাসে পৃথক জোনভিত্তিক পানির সরবরাহ ব্যবস্থা চালুর ওপরও জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে এবং অপচয় কমবে।

অধ্যাপক মাজেদা ইসলাম বলেন, সব ভবনে একইভাবে পানি সরবরাহ না করে ব্যবহার অনুযায়ী ভাগ করতে হবে। যেমন ছুটির সময় প্রশাসনিক ভবনে যতটা পানি প্রয়োজন, অ্যাকাডেমিক ভবন বা হলগুলোতে ততটা প্রয়োজন নাও হতে পারে।

সচেতনতা ও জবাবদিহিতা জরুরি

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, পানির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে পানি ব্যবহারে সচেতনতা তৈরি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীদের নিয়মিত তদারকি এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা হলে অপচয় অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সতর্কবার্তা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চিত্র শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলন। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে পানির সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি একটি সীমিত সম্পদ। এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে উন্নয়ন টেকসই হবে না। জাবির বর্তমান পরিস্থিতি তাই সংশ্লিষ্ট সবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

প্রতিদিন ১৫ লাখ লিটারের বেশি পানির অপচয়, দ্রুত নিচে নেমে যাওয়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, পুরোনো অবকাঠামো এবং অব্যবস্থাপনার সম্মিলিত প্রভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আজ এক সম্ভাব্য পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সর্বোপরি দায়িত্বশীল আচরণ। সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে আজকের এই সমস্যা আগামী দিনে বড় ধরনের বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে -এমনটাই সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সময়ের আলো/জোই 



  বিষয়:   চাহিদা  জাবি  পানি  অপচয়  জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 


Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: