নির্ভেজাল সুরা, নীল হলাহল
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি
এতো কোলাহল নিয়ে নিজের ভেতর— দিল পেরেশান
এতো আত্মরতি, হায়, যদি এ বেহাল দশার হতো অবসান
এ পথ আমাকে টানে, ওই পথও টানে, তৃণখড়কুটোর মতন
এ পেতে বাসনা জাগে, ও পেতেও জাগে, এতোটাই বেখেয়ালি মন
নিজের হৃদয়ে আমি বিঁধিয়ে দিয়েছি আজ নিজেরই নখর
নেকড়ে স্বভাবে হায়, ঝাঁপিয়ে পড়েছি নিজ পালের ওপর
কখনো নিখাদ সুরা, কখনোবা এই আমি নীল হলাহল
ভেজাল 'আমি'র ফেরে আত্মা ডুকরে ওঠে, ঝরে অশ্রুজল
চিরশিশু আমি এক, প্রেমের আঁচল ‘পরে পেতেছি শিথান
আমাকে ভুলিয়ে দিক আমার 'অহং', ঘুমপাড়ানিয়া কোনো গান
মাতালের বেশে ফিরি, হুঁশ-হারা, হে আমিন, ভুলেছি অতীত-বর্তমান
হয়েছে আমার প্রতি যতোটা জুলুম, কার কাছে চাই বলো তার সমাধান?
হৃদয় আমার তোমার কাছে
বেখেয়ালে, হৃদয় আমার
সঁপেছিলাম তোমার কাছে
জানি, তুমি ভুলেই গেছ
কিন্তু, আমার মনে আছে।
সিরিয়ার কবি নিজার কাব্বানির কবিতা
জেরুজালেম
চোখের জল ফুরিয়ে আসা অব্দি কেঁদেছি আমি,
প্রার্থনা করেছি মোমের আলো নিভে যাওয়ার আগ পর্যন্ত,
রুকুতে ছিলাম যতোক্ষণ না রুকু নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে
সওয়াল করেছি মোহাম্মদ আর ইসার ব্যাপারে
ও জেরুজালেম, পয়গম্বরদের সুবাসে মোড়া
আরশ ও জমিনের সংক্ষিপ্ততম পথ
ও জেরুজালেম, বিধিবিধানের তীর্থ
আনত চোখ আর দগ্ধ আঙুলের সৌম্যকান্তি শিশু
তুমিই সেই ছায়াচ্ছন্ন মরুদ্যান
যার ছায়ায় হেঁটে গেছেন নবী,
বিষাদে ছাওয়া তোমার সমস্ত পথ,
রোনাজারি করছে তোমার সকল মিনার।
ও জেরুজালেম, শোকের পোষাকে আবৃতা
কে বাজাবে পুনরুত্থান দিনের ঘণ্টি?
ক্রিসমাসের সন্ধ্যায়
শিশুদের জন্য বয়ে আনবে উপহার?
ও জেরুজালেম, দুঃখের নগরী,
কান্নায় ছলছল চোখ,
কে থামাবে তোমার ওপরে চলা
এই জুলুম, ও ধর্ম-শিরোমণি?
কেইবা মুছে দেবে তোমার রক্তাক্ত দেয়াল?
সুরক্ষা দেবে ইঞ্জিলের
আর উদ্ধার করবে কোরান?
যিশুকে যারা হত্যা করেছে
তাদের হাত থেকে কে বাঁচাবে যিশুকে?
কেইবা বাঁচাবে ইনসানকে?
ও জেরুজালেম, নগরী আমার
ও জেরুজালেম, প্রেয়সী আমার
আগামীকালই ফুলে ফুলে ছেয়ে উঠবে লেবুগাছগুলো,
আনন্দে মাতোয়ারা হবে যয়তুনের গাছ,
নেচে উঠবে তোমার দুচোখ,
ফিরে আসবে মোহাজির যতো কবুতর-
তোমার পবিত্র ছাউনিতে,
আর আবারো খেলায় মেতে উঠবে তোমার শিশুরা,
গোলাপশোভিত পাহাড়ে পাহাড়ে—
পিতা আর পুত্রের পুনর্মিলন হবে,
ও দেশ আমার,
ও শান্তি আর যয়তুনের দেশ।
বৈরুত, হে ভুবনমোহিনী
বৈরুত, হে ভুবনমোহিনী,
খোদার নামে স্বীকার করছি,
তোমার প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলাম আমরা,
আর তোমার সৌন্দর্য আহত করতো আমাদের
স্বীকার করছি,
তোমার সঙ্গে অনাচার করেছি আর ভুল বুঝেছি তোমাকে,
আমাদের দিলে রহম ছিল না এবং আমরা কৃপা করিনি তোমাকে,
ফুলের বদলে তোহফা দিয়েছি খঞ্জর
ন্যায়বান খোদার নামে স্বীকার করছি,
তোমাকে আঘাত করেছি,
হায় শ্রান্ত করেছি তোমাকে,
পীড়ন করেছি আর কাঁদিয়েছি,
নিজেদের হিংস্রতা চাপিয়েছি তোমার ওপর
ও বৈরুত,
তোমাকে ছাড়া অপূর্ণ এই জগত আমাদের কাছে,
অনুভব করেছি আমরা আজ—
আমাদের কতোটা গভীরে গেঁথে যাওয়া তোমার শেকড়,
আর কতোটা জুলুম করেছি আমরা তোমার ওপর
তবু, জাগো, ধ্বংসস্তূপ থেকে—
এপ্রিলের কাঠবাদাম ফুলের মতো,
নিজের দুঃখ ছাপিয়ে ওঠো,
শোকের ক্ষত থেকেই তো বিপ্লবের জন্ম হয়!
জাগো অরণ্যের সম্মানে,
নদীর সম্মানে জাগো,
জাগো মানুষের সম্মানে,
হে বৈরুত...
ফিলিস্তিনি কবি মারওয়ান মাকউলের কবিতা
অরাজনৈতিক কবিতা লিখতে হলে
অরাজনৈতিক কবিতা লিখতে হলে
আমাকে তো পাখিদের গান শুনতে হবে,
আর পাখিদের গান শুনতে হলে
তোমাকে থামাতে হবে যুদ্ধবিমানের আওয়াজ।
ফিলিস্তিনি কবি মুরিদ বারগুতির কবিতা
কারাগার
লোকটি বললো:
আশীর্বাদপুষ্ট খাঁচায় বন্দি পাখিরা,
কেননা ওরা অন্তত জানে
কারাগারের সীমানা।
নিস্তব্ধতা
নিস্তব্ধতা বললো:
সত্যের কোনো প্রয়োজন নেই কথা বলবার,
অশ্বারোহীর মৃত্যুর পর
তার ফিরে আসা ঘোড়াই
বলে দেয় সব,
কোনো শব্দোচ্চারণ ছাড়া।
ফিলিস্তিনি কবি সালমান মাসালহার কবিতা
অন্ধকার ঘরে
অন্ধকার ঘরে
তুমি এমন অনেক কিছুই দেখতে পাও
আলো-জ্বলা ঘরে যার দেখা মেলে না।
সুদূরের ভীনগ্রহী কোনো আলো
আঁধারে অবসন্ন হয়ে
ছায়ার মতো পিছলে পড়ে আঙিনায়।
জানালার গ্রিলে বসে
কুয়াশার মধু চুষে খায়
এক কৃষ্ণকায় পাখি।
গুপ্ত গ্রন্থের আশীর্বাণী
বয়ে চলেছি আমি।
উন্মোচন করি
অশ্রু উপত্যকার কাহিনী।
সেই লোকটা
যে সাঁতার কেটেছিল অগভীর জলে,
জড়ো করে গোল্ডফিশ
এঁদো ডোবাগুলো থেকে,
আর চোরদের নাগালের বাইরে
বাঁচিয়ে রাখে তাদের
সেই শিশুর জন্য
সামান্য এক অশ্রুবিন্দুতে যে ডুবে মরেছে।
অন্ধকার ঘরে
তোমার এমন অনেক কিছুই মনে পড়ে
যা ভুলে গেছ বিদেশবিভূঁইয়ে।
অন্ধকার,
সুদূর অতীতে ফেলে আসা এক শিশুর জন্য
হাহাকার থেকে উঠে আসে যা,
আছে এক গোপন-কুঠুরি
সেই শিশুর স্মৃতিতে ভরা।
অবরুদ্ধ— অতীতের মতো
বর্তমানকে ছুঁতেই পারেনি যা,
গাদাগাদি জীবনের মতো
অজস্র মৃত্যুতে ঠাসা।
ফিলিস্তিনি কবি হিবা আবু নাদার কবিতা
ভেঙে পড়ছে পুরো বংশগাছ
কেউ বেঁচে নেই, না কোনো শাখা-প্রশাখা।
হৃদয় বিদীর্ণ করে
সমূলে ভেঙে পড়ছে পুরোটা গাছ,
এক বিরানভূমিতে পরিণত হচ্ছে গাজা।
এই নগরী এক উন্মুক্ত গোরস্তান
ছড়িয়ে পড়ছে আরব লীগের দোরগোড়া থেকে
জাতিসংঘের মঞ্চগুলো পর্যন্ত।
আমরা তো খোদার কাছে নিজেদের সমর্পণ করেছি,
আর তাকিয়ে আছি নিজেদের কবরের দিকে
নিঃশ্চুপ ও ভারাক্রান্ত হয়ে।
২
আমাদের পারিবারিক ছবি:
ছিন্নবিচ্ছিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের পুটলি
ছাইয়ের স্তূপ
পাশাপাশি রাখা
ভিন্ন ভিন্ন আকারের পাঁচটি কাফন।
গাজার পারিবারিক ছবিগুলো আলাদা রকম:
একসঙ্গেই ছিল ওরা
একসঙ্গেই চলে গেলো
একসঙ্গেই।