মে দিবসে শ্রমিক-চাষির দীর্ঘশ্বাস, মরিচায় ঢেকে যাচ্ছে শিল্প-স্বপ্ন

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক অদ্ভুত নীরবতা। বিশাল ফটক, দীর্ঘ প্রাঙ্গণ, সারি সারি পুরোনো স্থাপনা- সবকিছু যেন

2026-04-30T12:44:50+00:00
2026-04-30T12:44:50+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
বন্ধ চিনিকলে হারিয়ে যাওয়া জীবিকার সুর
মে দিবসে শ্রমিক-চাষির দীর্ঘশ্বাস, মরিচায় ঢেকে যাচ্ছে শিল্প-স্বপ্ন
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম 
নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া রংপুর চিনিকল। ছবি : সময়ের আলো
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জে ঢুকতেই চোখে পড়ে এক অদ্ভুত নীরবতা। বিশাল ফটক, দীর্ঘ প্রাঙ্গণ, সারি সারি পুরোনো স্থাপনা- সবকিছু যেন এক নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া এক গৌরবের। এক সময় যেখানে আখ বোঝাই ট্রাক-ট্রলির দীর্ঘ সারি থাকত, শ্রমিকদের হাঁকডাক, যন্ত্রের গর্জন আর মানুষের ব্যস্ত পদচারণায় মুখর থাকত পুরো এলাকা- সেই রংপুর চিনিকল আজ প্রায় মৃত এক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতীক।

মহান মে দিবসে শ্রমের মর্যাদা, শ্রমিকের অধিকার আর ন্যায্য জীবিকার প্রশ্নে যখন বিশ্বজুড়ে নানা আলোচনা, ঠিক তখন উত্তরাঞ্চলের এই জনপদে হাজারো শ্রমিক, কর্মচারী আর কৃষকের জীবনে মে দিবস যেন কেবল দীর্ঘশ্বাসের আরেকটি দিন। কারণ, প্রায় ছয় বছর ধরে বন্ধ হয়ে থাকা রংপুর চিনিকলের সঙ্গে স্তব্ধ হয়ে আছে হাজারো পরিবারের জীবিকার চাকা, থমকে গেছে একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির স্পন্দন।

১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ, ১৯৫৭-৫৮ মৌসুমে উৎপাদন শুরু- রংপুর চিনিকল শুধু একটি কারখানা ছিল না, এটি ছিল উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক হৃৎস্পন্দন। প্রায় দুই হাজার একর জমির বিস্তৃত পরিসরে গড়ে ওঠা এ শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল কৃষি, ব্যাবসা, পরিবহন, শিক্ষা ও জনজীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক বলয়। সাতটি উপজেলার হাজার হাজার কৃষক আখ চাষ করতেন। মৌসুম এলেই আখ কাটার উৎসব শুরু হতো মাঠে মাঠে। চিনিকলের কর্মচাঞ্চল্যে জেগে উঠত মহিমাগঞ্জ। রেলস্টেশন জমে উঠত, ব্যাবসা বাড়ত, গড়ে উঠত অসংখ্য ছোট-বড় জীবিকার পথ।


আজ সেই মহিমাগঞ্জের বাতাসে বিষণ্নতার সুর। চিনিকলের মূল প্রাঙ্গণে এখন আগাছার দখল। ৩৫ একর কারখানা এলাকা জঙ্গলাকীর্ণ। খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা আখ পরিবহনের গাড়িগুলো মরিচায় ক্ষয়ে যাচ্ছে। কারখানার ভেতরে কোটি কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে পড়ছে। যে যন্ত্র একসময় চিনি উৎপাদনে সচল ছিল, আজ তা পরিত্যক্ত লোহার স্তূপে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায়।

কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষয়টা ঘটেছে মানুষের জীবনে। মিল বন্ধ হওয়ার পর স্থায়ী চাকরিজীবীদের একটি অংশ কোনোভাবে টিকে থাকলেও চুক্তিভিত্তিক ও মৌসুমি শ্রমিকদের জীবনে নেমে এসেছে নির্মম বাস্তবতা। যাদের শ্রমে-ঘামে উৎপাদনের চাকা ঘুরত, তাদের অনেকেই এখন ভ্যান চালান, দিনমজুরি করেন, কেউ কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসায় নেমেছেন, আবার অনেকে কাজের সন্ধানে জেলা ছেড়েছেন। বহু পরিবারে সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হয়েছে। কারও ঘরে চিকিৎসার টাকা নেই, কারও ঘরে নিয়মিত বাজার ওঠে না।

শ্রমিক নেতারা বলছেন, কেবল একটি কারখানা বন্ধ হয়নি, বন্ধ হয়েছে বহু মানুষের স্বপ্ন, মর্যাদা আর বেঁচে থাকার স্বাভাবিক পথ।

আখ চাষিদের অবস্থাও কম করুণ নয়। এই অঞ্চলে একসময় আখ ছিল নগদ অর্থকরী ফসলের প্রধান ভরসা। মাঠজুড়ে সবুজ আখের সমারোহ ছিল এ অঞ্চলের চেনা দৃশ্য। মিল বন্ধ হওয়ার পর সেই আখ চাষ প্রায় বিলুপ্তির পথে। কৃষকেরা বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকেছেন ঠিকই, কিন্তু অনেকেই বলছেন, আখের মতো নিশ্চিত বাজার আর কোনো ফসলে নেই। চিনিকল চালু থাকলে কৃষক, পরিবহণশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী- সবাই উপকৃত হতেন।

একজন প্রবীণ আখচাষির কণ্ঠে জমে থাকা আক্ষেপ, মিল ছিল বলেই আমাদের মাঠে আখ ছিল, ঘরে টাকা ছিল, বাজারে প্রাণ ছিল। এখন কিছুই নেই।

রংপুর চিনিকলকে ঘিরে আরেকটি বাস্তবতা এখন সামনে এসেছে- ভূমি নিয়ে টানাপড়েন। দীর্ঘদিন শিল্পকারখানা বন্ধ থাকায় এর বিশাল জমি নিয়ে নানা দাবি, পালটা দাবি, সামাজিক উত্তেজনা ও বিরোধ তৈরি হয়েছে। একদিকে ভূমি পুনরুদ্ধারের আন্দোলন, অন্যদিকে শিল্প পুনরুজ্জীবনের দাবি- এই দ্বৈত বাস্তবতা গোটা অঞ্চলকে জটিল এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে- যে শিল্প একসময় হাজারো মানুষের জীবনের ভিত্তি ছিল, সেটিকে আধুনিকায়নের নামে বন্ধ করে রেখে কেন অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ফেলে রাখা হলো? যদি আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি সত্যিই বাস্তবায়িত হতো, তবে হয়ত আজ এই জনপদের অর্থনীতি অন্যরকম হতো।

মে দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়- শ্রমিক কেবল উৎপাদনের শক্তি নয়, তিনি অর্থনীতির প্রাণ, সমাজের ভিত্তি। সেই শ্রমিক যখন কর্মহীন হন, তখন ক্ষতিগ্রস্ত শুধু একজন মানুষ নন- ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি পরিবার, একটি সমাজ, একটি অঞ্চল।

মহিমাগঞ্জের রংপুর চিনিকলের নীরব প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে তাই মনে হয়, এখানে শুধু যন্ত্র থেমে নেই- থেমে আছে বহু মানুষের জীবনের সুর। সেই হারিয়ে যাওয়া জীবিকার সুর ফিরিয়ে আনার প্রশ্নটি এখন কেবল অর্থনীতির নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, শ্রমের মর্যাদা আর উত্তরাঞ্চলের একটি জনপদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। মহান মে দিবসে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে মহিমাগঞ্জ, খুঁজছে গাইবান্ধা, খুঁজছে এই জনপদের হাজারো নীরব মুখ।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   মে দিবস  শ্রমিক  চাষি  দীর্ঘশ্বাস  মরিচা  শিল্প-স্বপ্ন  বন্ধ  চিনিকল  জীবিকা  গাইবান্ধা 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: