পাঁচটি কবিতা

মোসাব্বির আহে আলী

সাহিত্য

বালিহাঁস ও শকুন‘বালিহাঁসের মাংশের স্বাদ কেমন?’সেদিন ডিনারের আগে এই প্রশ্ন দিয়েই আমি বালিহাঁসের প্রসঙ্গ তুলেছিলামওদের উড্ডয়নভঙ্গি কিংবা বাসস্থানের বিষয়টি নয়শুনে

2026-05-01T18:38:37+00:00
2026-05-01T18:38:37+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সাহিত্য
পাঁচটি কবিতা
মোসাব্বির আহে আলী
প্রকাশ: শুক্রবার, ১ মে, ২০২৬, ৬:৩৮ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
বালিহাঁস ও শকুন

‘বালিহাঁসের মাংশের স্বাদ কেমন?’

সেদিন ডিনারের আগে এই প্রশ্ন দিয়েই আমি বালিহাঁসের প্রসঙ্গ তুলেছিলাম 
ওদের উড্ডয়নভঙ্গি কিংবা বাসস্থানের বিষয়টি নয়
শুনে রাতের খাবার দিতে আসা চাচা 
শৈশবে ফিরে গেলেন। তরকারির বাটি খুলতে খুলতে কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করলেন। 

জীবনের তার এখন বিকেল বেলা
সন্ধ্যায় হয়তো থাকবেন না
হয়তো বালিহাঁস তার শৈশবের কোন বিশেষ চরিত্র ছিল!
গরম ভাত বাটি থেকে প্লেটে রাখতে রাখতে তিনি বললেন—

‘শোন বাবা, সংগ্রামের বছর আমগো গাঁওয়ে এই বাইল্লাহাঁস বেশি খাওয়া পড়তো। আসমানে কড়কড় শব্দে বিমান উড়তো। বোমার আওয়াজে ওগো ঘাড়, ডানা উইল্টা যাইতো। তব্দা খাইয়া অজ্ঞান হইয়া পাগাড়ে, গোঁপাটে, জঙলায় পইড়া থাকতো। জীবনের ভয় নিয়াও আমরা ঐগুলা রাইন্ধা খাইতাম।’

আমি চুপ হয়ে গেলাম। ঐদিন আর ঐ প্রসঙ্গে আলাপ হ’লো না। ঐ বিদঘুটে আশ্চর্য সময়টা নিয়া ভাবনায় ডুবে গেলাম।

পরেরদিন আবার ডিনারে চাচাকে বললাম—
‘বালিহাঁস বাদ দেন, মানুষ যেগুলা বোম খাইয়া, গুলি খাইয়া তব্দা খাইয়া পইড়া থাকতো সেগুলা কারা খাইতো, চাচা?’

চাচা দেরি না করে উত্তর দিল—
‘আকাশে পাকিস্তানী বিমানের সাথে শকুনের দলও উড়তো। মানুষের চোখ ছিল ওদের অনেক প্রিয়। ওইটা দিয়া ওরা শুরু করতো।’

ক্ষণিকাশ্রয় 

নক্ষত্রের স্নিগ্ধ রোদে, চার নম্বর সেক্টরের ১৪ নম্বর রোডে, এই কার্তিকের শেষাশেষি হাঁটছি। অফিস আমাকে পাঠিয়েছে সামান্য হ্যালো চালাচালি আর চা পর্বে।
কিন্তু এই রোডে ঢুকেই আমি অন্য আমি হয়ে গেলাম।
ক্ষনিকাশ্রয় নামের কোন একটি বাড়ি হয়তো পেরোচ্ছি, 
মনে হলো ছিমছাম ডুপ্লেক্সটি শীতের রোদে বাকবাকুম করছে। বারান্দায় দুটো চেয়ার যেন কুয়াশাভেজা। দেখলাম কিছু রাঙা গুল্ম বেয়ে আছে পাশের রেলিং। নিচে ঘাস ছাটার মেশিনে ঠিকরাচ্ছে আলো। 

নভেম্বরের নরম রোদ পড়েছে পাতাবাহারে, নীল গেটে। হয়তো এ বাড়ির কিছু বাসিন্দা এখন ঘুমিয়ে আছে ইউরোপের কোন দ্বীপে। হয়তো ভেতরের ঘরে ধুঁকছে তাদের বৃদ্ধা মালকিন, একা। তাকে ফেলে সবাই ইউরোপে। সন্তান ও তাদের সন্তানেরা। সবাই।

নক্ষত্রের আলো এই দুপুরে, ভাসিয়ে দিচ্ছে ১৪ নম্বর রোডের এই বাড়ি। এই ক্ষনিকাশ্রয়ে, উৎসবে উৎসবে শিশুদের ইংরেজি হট্টগোল শোনা যায় হয়তো, অনুমান করছি। ভেতরের আরো ভেতরের ঘরে হয়তো বাহারি বুক শেল্ফ আছে বিরাট। সেখানে থাকতে পারে বিভূতিভূষণ বা নেরুদা। হুয়ান রুলফ বা মার্কেজ। কে জানে?

আমি বাড়িটা পার হচ্ছি আর ভাবছি, এ বিরাট বাড়িতে পড়া পায়ের চিহ্ন কি খুব বেশি? আমাদের মত সস্তা? খুব ঘন?

স্নানঘাটে, অবগুন্ঠনের দিনে 

আলপিনে কিছু গেঁথে রাখো শিস
আঁটসাঁট তোমার স্কুলড্রেস আর টানা চোখ

ঠাঁকুর ও নিষেধাজ্ঞার চটি পাশাপাশি
শুয়ে আছে স্কুলব্যাগে—

বাঁশপাতা-ভাসা পুকুরে টিউশনির ছায়া
ফেলে এগোনো হলুদ আমব্রেলাটি
তোমার নাতিদীর্ঘ বেণীর প্রান্তখানি
তখন দেখতাম মগজে; 
করোটিতে তোমার চঞ্চল দড়িলাফ
টলিয়ে দিত আমার অদৃশ্য পম্পেই 

তবু তার থেকে কিছু তুলে আনি মায়াবী মীন
প্রচ্ছন্ন পুচ্ছের বেগুনী মাছটির চোখ 

উগ্র ভিউকার্ডের কাটা মাথায় 
তোমায় বসানো যেতো সহজেই
প্রশস্ত কাঁধের নিচে 
তোমার সোনালী লোমের ভাটি
মনে রাখি নি

এগুলোর কিছু ক্লান্ত দৃশ্যে
আঠায় লেগে যাওয়া পৃষ্টার বাইরে
তোমাকে অনাবৃত করা যেতো

স্নানঘাটে, অবগুন্ঠনের দিনে
আমি তা করি নি!

পবিত্র পাহাড়

বিচিত্র পাদুকার পসরা সাজিয়েছি 
এক ইয়েমেনি বালক আমি, 
অপূর্ব সকালে, আশ্চর্য এক বিতানে
      মক্কায় ওকাযের মেলায়;

আশান্বিত আসছে উটের পিঠে
রোদপোড়া দূরাগত বণিকেরা
চিনা রেশম, মালয় মশলা
                  ধবধবে ইরানি গম

এগিয়ে আসছে পা নানান হেঁটে হেঁটে
ফোসকা-পড়া- হাবশি; 
উমাইয়ান সড়ক পেরোয় কাফেলারা
আমি পাদুকা এগিয়ে দিই
আরব্য ভব্যতায়—

বলি, — উত্তপ্ত মরুতে পাদুকা জরুরি
পাদুকার ওপর দাড়িয়ে থাকে পা 
পায়ের উপর দাড়িয়ে থাকে শরীর
আপনারা ভ্রমণক্লান্ত, অন্যকিছু 
কেনার আগে পাদুকা কিনুন
আপনি উটে আরামে  সওয়ার 
খানিক ভৃত্যদের পায়ের দিকে তাকান—!'

এগিয়ে আসে মিশরীয় উটের গোশত,
তার শুকিয়ে বানানো বড়ির ঝুড়ি
সারি সারি হস্তশিল্প-
কু্শ-কাঁটা শিকাই
আর ফিলিস্তিনি নারীবাহিত ফলের মটকা

সব গিয়ে মিশেছে কা’বা-য়
একেশ্বরের প্রাচীন সে ঘরকে ঘিরে
ব্যবসা, বাদ্য আর অনুষ্ঠান

চারদিকে হৈচৈ —ভরাট বাজছে দফ
দুপাশে পবিত্র পাহাড়

ইয়েমেনি বালক আমি, আজ হলো
তিনদিন, যদিও পিতা সঙ্গী আমার

একটু আগে তিনি কা'বার মঞ্চের 
দিকে গেলেন
শুনেছেন ওখানে কবিতা পড়া হবে

পিতা দুই একটা কবিতা লিখেছেন জীবনে
আমাকে তাই একা দোকানে রেখে গেছেন।

গাঁতা বন্ধ

গাঁতা বন্দ
মানে দূরই মাঠ
যেহানে ফিরা আহে একলা 
মাটি ঠোকরাইয়া বিটগড়ের পাখি
ডাঁহি দেওয়া কার্তিকের জলডোবা ক্ষেতে 
বাবজুট্টা আমরা বান্দ দেই
বাড়ি দিয়া দিয়া কলাগাছের ডাউগ্গায়
টাকি-কৈ-বাইম
বান্দে ঢোহে

আম্মা সড়গে আইসা খাড়ায়
একটা ময়লা শাড়ির আঁচল
টাইনা টাইনা কানে গুঁইজা
ডাক দেয়—
‘বাইত আইতে না অহনো?
ঠিক দুফরে সুন্দর পোলা, ঘরে আয়’

একটা ক্যাঁচকাওয়া,
খুডিত বইয়া বিশ্বরোডরে ডাহে
ঢাকা টু সিলেটের কোচ পলাইয়া যায় তাগদা!
সরাজ মামুর থেইকা বাগি নেওয়া
আমরার এক কানি ক্ষেত আব্বারে ভেঙ্গায়
গাঁতা বন্দ মানে দূরের গহীন মাঠ
কানি কানি ক্ষেত আস্করালি কাহা'র
গাঁতা বন্দ মানে ডোরাকাটা গুতোমের পলায়ন
প্যাঁকে আটক একলা ভ্যাঁদা মাছ


  বিষয়:   কবিতা  সাহিত্য  মোসাব্বির আহে আলী 


Loading...
Loading...
সাহিত্য- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: