একসময় এই ঘাট ছিল উত্তরাঞ্চলের হৃৎস্পন্দন। বালাসীঘাট দিয়ে চলত মানুষ, পণ্য। সেই ঘাট আজ নিস্তব্ধ, নদীর বুকে শুধু বালুচর, টার্মিনাল ভবনে ধুলোর আস্তর। কিন্তু শুক্রবার বিকেলে সেই নীরব ঘাট হঠাৎ সরব হয়ে উঠল হাজারো মানুষের কণ্ঠে। দাবি একটাই, গাইবান্ধার বালাসীঘাট থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ পর্যন্ত নির্মাণ করতে হবে দ্বিতীয় যমুনা সেতু।
অচল ফেরিঘাটের বেদনা
বিগত সরকার ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয় করে বালাসীঘাটে আধুনিক ফেরিঘাট টার্মিনাল নির্মাণ করেছিল। বিশাল টার্মিনাল ভবন, ব্যারাক, টোলপ্লাজা-অবকাঠামোর কোনো কমতি নেই। কিন্তু নেই ফেরি, নেই যাত্রী। নদীতে নাব্য সংকট ও চর জেগে ওঠায় ফেরি চলাচল কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এই বাস্তবতাই আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের কেন্দ্রে। সমাবেশে বক্তারা বলেন, যেখানে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে অচল ফেরিঘাট নির্মাণ করা যায়, সেখানে একটি পরিকল্পিত, টেকসই সেতু নির্মাণ কেন সম্ভব নয়?
আট জেলার মানুষের প্রাণের দাবি
বক্তারা জানান, বালাসী-বাহাদুরাবাদ রুটে সেতু নির্মিত হলে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, ঠাকুরগাঁওসহ উত্তরাঞ্চলের অন্তত আট জেলার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। ঢাকায় যাতায়াতে পথ কমবে ১৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার। কমবে পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ, তৈরি হবে নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কসেতুর পাশাপাশি রেলসেতু নির্মাণ করা গেলে এই করিডোর উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে আনবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর বিদ্যমান অতিরিক্ত চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
সর্বদলীয় ঐক্যের মঞ্চ
বিশ্বাস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ওয়াহেদুজ্জামান বিশ্বাস তোহার সভাপতিত্বে এবং উপজেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক আবু সাঈদের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও পেশাজীবী মহলের প্রতিনিধিরা।
বক্তাদের মধ্যে ছিলেন ফুলছড়ি উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুল বাছেদ, বুড়াইল কলেজের অধ্যক্ষ ইব্রাহিম আকন্দ সেলিম, গাইবান্ধা জেলা চেম্বার অব কমার্সের সহ-সভাপতি তৌহিদুর রহমান মিলন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র জাহিদ হাসান জীবন, কঞ্চিপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান সোহেল রানা শালু প্রমুখ। জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি ও গণ অধিকার পরিষদের স্থানীয় নেতারাও মঞ্চে একত্রিত হন, যা এই আন্দোলনের সর্বদলীয় চরিত্রকে স্পষ্ট করে তোলে।
প্রত্যাশার পাড়ে দাঁড়িয়ে
ব্রিটিশ আমলে তিস্তামুখ ঘাট হয়ে উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকার যে পথ চলত, কালের পরিক্রমায় তা এসে ঠেকেছে বালাসীতে। নদীর নাব্য হারানোর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে সেই পুরনো যোগাযোগ। এখন মানুষ আর নদী খনন বা সাময়িক সমাধানে আস্থা রাখতে রাজি নয়। তারা চান স্থায়ী, দৃশ্যমান এবং টেকসই সংযোগ।
যমুনার বাতাসে শুক্রবার ভেসে বেড়ায় একটাই সুর-বালাসী থেকে বাহাদুরাবাদ, চাই দ্বিতীয় যমুনা সেতু।