চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌরসভার দক্ষিণাংশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী ঝরঝরি খাল এখন অস্তিত্ব সংকটে। এক সময় যা ছিল পাহাড় থেকে সমুদ্র পর্যন্ত পানি নিষ্কাশনের প্রধান ধমনী, আজ তা দখল, দূষণ আর অব্যবস্থাপনায় পরিণত হয়েছে একটি সরু নালায়। ফলে বর্ষা মৌসুম আসার আগেই উপকূলীয় এই জনপদের মানুষের চোখে-মুখে জলাবদ্ধতার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি চন্দ্রনাথ পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানি দ্রুত সমুদ্রে নিষ্কাশনের প্রধান প্রাকৃতিক পথ হিসেবে পরিচিত ছিল। স্থানীয় কৃষিকাজ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রেও ঝরঝরি খাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে খালটি বর্তমানে তার স্বাভাবিক গতিপথ ও নাব্য হারিয়ে ফেলেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খালের দুপাশে প্রভাবশালী মহল থাবা বসিয়েছে। খালের সরকারি জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে দোকান, গুদাম ও বসতঘর। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য ফেলার সংস্কৃতি। প্লাস্টিক ও অন্যান্য গৃহস্থালি বর্জ্যে খালের তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আনিসুল ইসলাম জানানা, সরকারি সিটভুক্ত এই খালটি পাহাড় থেকে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত হলেও দুপাশে এখন অধিকাংশ জায়গা দখল হয়ে গেছে। দ্রুত উদ্ধার করা না হলে মানচিত্র থেকেই খালটি হারিয়ে যাবে।
বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের পানি চৌধুরীপাড়া, হাসান গোমস্তা মসজিদ এলাকা, আমিরাবাদ ও পশ্চিম মিরাবাদ হয়ে এই খালে জমা হয়। কিন্তু নাব্য সংকটের কারণে পানি নামতে না পেরে বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে। অতিবৃষ্টির সময় সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনসহ সরকারি বিভিন্ন দফতরেও পানি ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটছে, যা নথিপত্র নষ্টের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
আমিরাবাদ গ্রামের বাসিন্দা মোজাহির উদ্দিন আশরাফ আক্ষেপ করে বলেন, এক সময় এই খাল ছিল আমাদের বাঁচার ভরসা, এখন সেটাই অভিশাপে পরিণত হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই এলাকা ডুবে যায়, ফসল নষ্ট হয়, আমাদের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। কৃষকদের মতে, জলাবদ্ধতায় প্রতি বছর শত শত একর জমির ফসল নষ্ট হওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফখরুল ইসলাম জানান, জাতীয় পর্যায়ের খাল খনন কর্মসূচির আওতায় পৌরসভার একটি খাল এবং সৈয়দপুর ইউনিয়নের বাঁকখালী খাল খননের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত কাজ শুরু হবে এবং পর্যায়ক্রমে ঝরঝরি খালসহ অন্যান্য খালগুলোকেও খনন ও দখলমুক্ত করার আওতায় আনা হবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক আসলাম চৌধুরীকেও বিষয়টি অবহিত করেছে এলাকাবাসী। আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগেই এই জীবনদায়ী খালটি সংস্কার ও দখলমুক্ত করার কার্যকর পদক্ষেপ দেখার অপেক্ষায় এখন সীতাকুণ্ড।
সময়ের আলো/জোই