গাজা আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত। কিন্তু সেই ধ্বংসের মধ্যেও হারিয়ে যায়নি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি আর স্মৃতি। এক দল গবেষক ও সাংবাদিক মিলে এমন এক উদ্যোগ নিয়েছেন, যেখানে ভার্চুয়াল প্রযুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের আগের গাজাকে দেখা যায়, অনুভব করা যায়- যেন সময় থেমে আছে ধ্বংসের আগেই। এভাবেই ধ্বংসের পর্দা সরিয়ে স্মৃতির শহরে সফরের পথ তৈরি হয়েছে।
স্মৃতির শুরু : নাঈম আবুরাদি বহু বছর গাজা থেকে দূরে ছিলেন। অবরোধ আর বাস্তবতার সীমাবদ্ধতায় নিজের শহরে ফেরা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তখনই তিনি ভাবলেন অন্য পথ। সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে একটি ৩৬০ ডিগ্রি ক্যামেরা পাঠানো হয় গাজায়।
স্থানীয় সাংবাদিক আহমাদ হাসাবাল্লাহ সেই ক্যামেরা নিয়ে শহরের অলিগলি, বাজার, সমুদ্রতট, পুরোনো হামাম- সব জায়গার দৃশ্যধারণ করেন। ছয় মাস পর সেই ফুটেজ ফিরে আসে। আর তা দেখে আবুরাদি আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। তার কাছে এটি শুধু ভিডিও ছিল না, ছিল হারানো ঘরে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি।
এক্সআর প্রকল্পের বিস্তার : এই কাজ ধীরে ধীরে বড় প্রকল্পে রূপ নেয় ‘দ্য ফিনিক্স অব গাজা এক্সআর’। এর লক্ষ্য ছিল বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা ফিলিস্তিনিদের সামনে গাজাকে নতুনভাবে তুলে ধরা। যারা কখনো গাজায় যেতে পারেননি, তাদের জন্য এটি হয়ে ওঠে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এখানে দর্শকরা গাজার রাস্তায় হাঁটতে পারেন, সমুদ্রের ঢেউ দেখতে পারেন, মসজিদ বা গির্জার ভেতরে দাঁড়িয়ে চারপাশ ঘুরে দেখতে পারেন। যেন বাস্তবেই সেখানে উপস্থিত।
হঠাৎ বদলে যাওয়া বাস্তবতা : কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর সবকিছু বদলে যায়। যে জায়গাগুলো ক্যামেরায় ধরা হয়েছিল, একে একে সেগুলো ধ্বংস হতে থাকে। বাড়িঘর, রাস্তা, স্কুল, উপাসনালয়- সবই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
প্রকল্পের ভিডিওগ্রাহক হাসাবাল্লাহও প্রাণ বাঁচাতে পালাতে বাধ্য হন। তার বাড়ি ধ্বংস হয়, পরিবার হারায় প্রিয়জন। ক্যামেরাটিও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায়। তখন এই প্রকল্প শুধু একটি অভিজ্ঞতা নয়, হয়ে ওঠে ইতিহাসের সংরক্ষণাগার।
ধ্বংস ও পুনরায় ধারণ : পরবর্তী সময়ে দলটি আবার সংগঠিত হয়। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ক্যামেরা উদ্ধার করা হয়। নতুন করে কিছু জায়গার বর্তমান অবস্থা ধারণ করা হয় স্থানীয় সাংবাদিক ইয়াহইয়া সোবিহের মাধ্যমে। দর্শকরা এখন একই জায়গার আগে ও পরে- দুই চিত্রই দেখতে পারেন।
একদিকে জীবন্ত শহর, অন্যদিকে ধ্বংসস্তূপ। এই তুলনা দর্শকদের নাড়িয়ে দেয়। অনেকেই বলেন, এই অভিজ্ঞতা তাদের ভেতরে গভীর অনুভূতি তৈরি করে, যা সাধারণ ভিডিওতে সম্ভব নয়।
মানবিক গল্প ও ক্ষতি : এই প্রকল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের গল্পও কম মর্মান্তিক নয়। ইয়াহইয়া সোবিহ ২০২৫ সালে এক হামলায় নিহত হন। তিনি তখন নিজের সন্তানের জন্ম উদযাপন করছিলেন। তার স্ত্রী পরে এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এভাবে প্রকল্পটি শুধু শহরের স্মৃতি নয়, মানুষের জীবন আর সংগ্রামের গল্পও তুলে ধরে। নিহত সাংবাদিকদের স্মৃতিও এখানে জীবন্ত হয়ে থাকে।
স্মৃতি, প্রতিরোধ ও ভবিষ্যৎ : এই উদ্যোগ এখন বিশ্বজুড়ে প্রদর্শিত হচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে মানুষ এই অভিজ্ঞতা নিচ্ছেন।
গবেষকরা বলছেন, এটি শুধু শিল্প নয়, এটি প্রমাণও হতে পারে- যুদ্ধাপরাধ তদন্তে কিংবা ভবিষ্যতে গাজা পুনর্গঠনে। সবচেয়ে বড় কথা, এটি দেখিয়ে দেয়- ধ্বংস দিয়ে সবকিছু মুছে ফেলা যায় না। আবুরাদির ভাষায়, স্থান ধ্বংস করা যায়, মানুষ হত্যা করা যায় কিন্তু স্মৃতি মুছে ফেলা যায় না। গাজার এই স্মৃতিই হয়তো একদিন আবার নতুন করে শহরটি দাঁড় করাবে।
/এসএকে