২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মোড় দেখা দিয়েছে। তথ্য ও বর্তমান নির্বাচনী ট্রেন্ড অনুযায়ী, বিধানসভায় মুসলিম বিধায়কদের সংখ্যার ক্ষেত্রে একটি ‘অদৃশ্য সিলিং’ বা সর্বোচ্চ সীমার বিষয়টি বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস তাদের ৪৭ জন মুসলিম প্রার্থীর (মোট ১৬.১৫ শতাংশ) মধ্যে অধিকাংশকে জয়ী করতে সক্ষম হলেও সামগ্রিক মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা অতীতের রেকর্ড ভাঙতে পারছে না।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ৪৬ জন এবং ২০১১ সালে ৫৯ জন মুসলিম বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে এই সংখ্যা সীমাবদ্ধ থাকছে প্রায় ৪০ থেকে ৪২-এর মধ্যে।
আসনভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, মেটিয়াব্রুজ কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী আবদুল খালেক মোল্লা ৮৭ হাজার ৮৭৯ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে নজির গড়েছেন।
অন্যদিকে, কলকাতার বন্দর আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী ফিরহাদ হাকিম ৫৬ হাজার ৪৯০ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। কসবা কেন্দ্রে তৃণমূলের বিদায়ী বিধায়ক জাভেদ আহমেদ খান ২০ হাজার ৯৭৪ ভোটে জয়ী হলেও ২০২১ সালের নির্বাচনে তার জয়ের ব্যবধান ছিল ৬৩ হাজার ৬২২ ভোট, যা এবার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
মুর্শিদাবাদ জেলা বরাবরের মতো মুসলিম বিধায়কদের প্রধান উৎস হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। এ জেলায় তৃণমূলের বাবর আলি জলঙ্গী আসনে, নিয়ামত শেখ হরিহরপাড়া আসনে, মুহাম্মদ নূর আলম শামশেরগঞ্জ আসনে এবং মুস্তাফিজুর রহমান ভরতপুর আসনে জয়লাভ করেছেন। ভগবানগোলা আসনে তৃণমূলের রেয়াত হোসেন সরকার ৫৬ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। মালদা জেলার সুজাপুর আসনে তৃণমূলের সাবিনা ইয়াসমিন ৬০ হাজার ২৮৭ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে আধিপত্যের প্রমাণ দিয়েছেন। এছাড়া মথাবাড়ি আসনে তৃণমূলের নজরুল ইসলাম জয়ের পথে এগিয়ে রয়েছেন। বীরভূম জেলার হাসন কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের কাজল শেখ এবং উত্তর ২৪ পরগনার দেগঙ্গা কেন্দ্র থেকে আনিসুর রহমান বিদেশ জয়ী হয়েছেন।
বিরোধী শিবিরে ভাঙ্গড় আসনে আইএসএফ প্রার্থী নওসাদ সিদ্দিকী জয়ী হয়ে সংখ্যালঘু রাজনীতির একটি পৃথক ধারা বজায় রেখেছেন। মুর্শিদাবাদের ডোমকল আসনে সিপিএমের প্রার্থী মুস্তাফিজুর রহমান রানা জয়ী হয়েছেন, যা বামদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এছাড়া আম জনতা উন্নয়ন পার্টির (এজেউপি) প্রার্থী হুমায়ুন কবীর মুর্শিদাবাদের রেজিনগর ও নওদা এই দুটি আসন থেকেই জয়ী হয়ে চমক সৃষ্টি করেছেন। কংগ্রেসের টিকিটে মুসলিম প্রার্থীরা অংশগ্রহণ করলেও সামগ্রিক সংখ্যায় তারা পিছিয়ে রয়েছে।
এই নির্বাচনের একটি বড় পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন হলো বিজেপির অবস্থান। দলটি তাদের প্রার্থী তালিকায় কোনো মুসলিম প্রতিনিধি না রাখায় এবং প্রায় ১৮১ থেকে ২০৪টি আসনে এগিয়ে বা জয়ী হওয়ায় রাজ্যের একটি বড় অংশের বিধানসভা কেন্দ্র থেকে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব সম্পূর্ণভাবে শূন্য হয়ে গেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মুসলিম ভোটব্যাংকের সংহতি বজায় থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলগত পরিবর্তন এবং প্রার্থী বণ্টনের কারণে বিধানসভায় মুসলিম প্রতিনিধিত্বের একটি সর্বোচ্চ সীমা শুরুতেই নির্ধারিত হয়ে যায়। ফলে জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও বিধানসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব নিম্নমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে।
সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, পৃথক আসনে প্রার্থীদের বড় ব্যবধানে জয় থাকলেও সামগ্রিক সংখ্যাতত্ত্বে মুসলিম প্রতিনিধিত্বে সংকোচন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।