কক্সবাজারের টেকনাফে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে বিশাল এলাকাজুড়ে নির্মিত হচ্ছে সুউচ্চ সীমানাপ্রাচীর। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বনের মাঝে বন্যপ্রাণী চলাচলের পথে বিশাল আয়তনের সুউচ্চ সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজ শেষ হলে বন এবং বন্যপ্রাণী মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের নয়াপড়া এলাকায় ২৬ নং শালবাগান ক্যাম্পের প্রান্ত সীমানায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর নির্মিত হচ্ছে বিশাল আয়তনের সুউচ্চ এক সীমানা প্রাচীর। সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে নির্মিতব্য এই সীমানা প্রাচীরের উচ্চতা হবে ১০ ফুট। আর রাউন্ডিং হবে অন্তত ১ হাজার ফুট। নির্মাণকাজে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) সরাসরি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এটি করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন নির্মাণকাজে সংশ্লিষ্ট ওই ব্যক্তি।
পরিবেশ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বনের ভেতরে এত বিশাল এলাকাজুড়ে সুউচ্চ সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হলে জীব বৈচিত্র্যের জন্য যেমন ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে, ঠিক তেমনি ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের জন্যও দূর ভবিষ্যতে এটি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সরেজমিন কথা হয় রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে। এ সময় তারা মন্তব্য করেন, নিকট ভবিষ্যতে এই সীমানা প্রাচীরকে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকা অপরাধজোন হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে কথা হয় সীমানা প্রাচীর নির্মাণকাজ বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মো. মোখতারের সঙ্গে। এ সময় তিনি বলেন, ৮ থেকে ১০ ফুট উচ্চতার সীমানাপ্রাচীরের দুদিকেই রয়েছে পাহাড়। তাই রাউন্ডিং ফুট ঠিক কত হবে তা আপাতত নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। তবে ধারণা করা যায় সীমানাপ্রাচীরের রাউন্ডিং এক হাজার ফুটের কম হবে না।
স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, ক্যাম্পের সব কাজই রোহিঙ্গাদের দিয়ে করানো হয়। ক্যাম্পের বাইরের কাউকেই কোনো প্রকল্পে কাজ করার কোনো সুযোগ দেওয়া হয় না। রোহিঙ্গাদের দিয়েই বিশাল এই প্রজেক্টটি বাস্তবায়িত করা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে প্রশ্নের জবাবে সীমানা প্রাচীর নির্মাণকাজ বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি মো. মোখতার বলেন, এখানে সবাই কাজ করছেন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভাই সরেজমিন আসেন। সামনাসামনি বসে কথা বলব। এর পরপরই মুঠোফোনের লাইন কেটে দেন তিনি।
জানতে চাইলে বন্যপ্রাণী গবেষক সরোয়ার আলম দীপু বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে স্থাপনা বা কোনো ধরনের কিছু করতে হলে সবার আগে অবশ্যই পরিবেশগত ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট তথা ইআইএ করতে হবে যাতে করে ভবিষ্যতে বন এবং বন্যপ্রাণীর ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ২৬ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, আসলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের কোনো হাত নেই। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্রের আলোকে আরআরআরসি এবং ইউএনডিপির সমন্বয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়। এ প্রসঙ্গে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (কক্সবাজার দক্ষিণ) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সংরক্ষিত বনে এত বিশাল আয়তনের সুউচ্চ সীমানাপ্রাচীর নির্মিত হচ্ছে, অথচ আমি কিছুই জানি না।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (কক্সবাজার দক্ষিণ) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন আরও বলেন, বনের মাঝে বিশাল আয়তনের এই দেয়াল নির্মাণ করা হলে বন ও বন্যপ্রাণীর মারাত্মক ক্ষতি হবে। বন্যপ্রাণীর চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি বন্যপ্রাণীসহ অনেক সরীসৃপ প্রাণীরও বিলুপ্তি ঘটতে পারে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের শালবাগান এবং ন্যাচার পার্ক এলাকায় সংরক্ষিত বনে প্রায় ২৮৬ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে। বনাঞ্চনের গহিনে তাদের বিচরণ। বনে রোহিঙ্গাদের বিচরণ ও আবাসস্থল নির্মাণের কারণে বন্যপ্রাণীরা গহিন বনে নিজেদের আপন ঠিকানা করে নিয়েছে। আবার অনেক বন্যপ্রাণী অন্যত্র চলে গেছে। অনেক বন্যপ্রাণী আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
বন ও বন্যপ্রাণী গবেষকদের মতে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের লেদা থেকে শালবাগান এবং ন্যাচার পার্ক সংলগ্ন বন পশু-পাখির অভয়ারণ্য। উল্লেখিত বনাঞ্চল পশু-পাখির খাদ্যের জোগানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রোহিঙ্গাদের চলাচলের কারণে পশু-পাখি এখন বনের গহিনে চলে গেলেও তাদের বিচরণ রয়েছে টেকনাফ গেম রিজার্ভের এসব এলাকায়।
এসব বিষয়ে জানতে কথা হয় টেকনাফ রেঞ্জের আওতাধীন বন পাহারা দলের সদস্যদের সঙ্গে। এ সময় তারা জানিয়েছেন, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের ওই এলাকায় বানর, শিয়াল, বন মোরগ, হাতি, সরীসৃপসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বিচরণ এখনও চোখে পড়ে। রোহিঙ্গাদের জন্য আবাসস্থল তৈরির কারণে বন্যপ্রাণীরা বনের কাছাকাছি থাকতে পারছে না। এসব জায়গা এখন বন্যপ্রাণীদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। তাই তারা গহিন বনে নিজেদের ঠিকানা করে নিয়েছে। একদিকে খাদ্য সংকট, অন্যদিকে বিপন্ন আবাসস্থল; সব মিলিয়ে মহাসংকটে টেকনাফের বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী। এর মধ্যেই মুচনী বিটের শালবাগানের ওপারে বনের মাঝে সুউচ্চ ও বিশাল আয়তনের সীমানা প্রাচীর নির্মিত হলে ২ শতাধিক বন্যপ্রাণীর চলাচল হুমকির মুখে পড়বে। এ ছাড়া বনাঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র গড়ে উঠলে বন্যপ্রাণী এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে।
পরিবেশবাদীরা বলছেন, বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ নিশ্চিত করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি বনের গাছ-গাছালি এবং বন্যপ্রাণীর স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাও অত্যন্ত জরুরি।