অবশেষে ৮ দিন পর মঙ্গলবার রোদ-ঝলমল সকাল দেখলেন হাকালুকি হাওড় পাড়ের কৃষকরা, ফেললেন পরম স্বস্তির নিশ্বাস। কথা বলার সময় নেই কারও। সবাই ব্যস্ত ধান মাড়াই, নিড়ানি কিংবা রোদে ধান শুকানোর কাজে। এমন চিত্র কোরবানপুর, সাদিপুর, গৌড়করণ, মহেষগৌরী, চিলারকান্দি, শমারকান্দি, বাদে ভুকশিমইলসহ হাকালুকি হাওড় পাড়ের গ্রামগুলোয়।
হাকালুকি হাওড় পাড়ের ভুকশিমইল ইউনিয়নের মেম্বার মধু মিয়া ও জয়চণ্ডী ইউনিয়নের মেম্বার বিমল দাস জানান, হাকালুকি হাওড়ে মাছের পর বোরো ধানই হচ্ছে কৃষকদের বাঁচার অন্যতম অবলম্বন। হাকালুকি হাওড় পাড়েই পাহাড়ি এলাকা। ফলে বৃষ্টিপাত হলে পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগের মধ্যে সর্বপ্রথম হাকালুকি হাওড়ের বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে হাকালুকি হাওড়ের বোরো ধান রক্ষায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
কুলাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন জানান, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা প্রদানের নির্দেশ এসেছে। তালিকা প্রস্তুত করছে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস (পিআইও)। ফলে তারাই নিশ্চিত করতে পারবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা কতটা স্বচ্ছ হচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন আরও বলেন, হাকালুকি হাওড় পাড়ের বোরো ফসল রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। হাকালুকি হাওড় যদি হাওড় উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত করা যেত তা হলে হাওড়ের ফসল রক্ষার বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্ব পেত। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, সেই মহাপরিকল্পনায় হাকালুকি হাওড় নেই।
কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় যাতে প্রকৃত কৃষকের নাম থাকে সে ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দেব। আগাম বন্যা থেকে বোরো ধান রক্ষায় পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। তার জন্য প্রস্তাবনা গ্রহণ করে একটি পরিকল্পনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো যেতে পারে। হাকালুকি হাওড় পাড়ের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে কর্মশালা করা গেলে ভালো হতো বলেও মন্তব্য করেন ইউএনও।
সরেজমিন কথা হয় হাকালুকি হাওড় পাড়ের জয়চণ্ডী ইউনিয়নের আবুতালিপুর গ্রামের কৃষক ললিত চন্দ্র নাথ, জিতেন্দ্র দাস, কাজল মিয়া, উস্তার মিয়া, আরব আলী, সেলিম মিয়া, মনিন্দ্র দাস, বেগমানপুর গ্রামের খেলা বিশ্বাস ও কিরেন্দ্র দাসের সঙ্গে।
তারা জানালেন, গত ৭-৮ দিন বৈরী আবহাওয়া মোকাবিলা করে পানির পেট থেকে কেটে তোলা হয়েছে ধান। বৃষ্টি-বাদলায় ধানগুলোতে পচন ধরেছে। ৮ দিন পর রোদের দেখা মিলেছে। মাড়াই করে ধানগুলো শুকানো যাবে। হাওড় থেকে পানি কমায় যেসব ধানী জমি পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল, সেগুলো আবার ভেসে উঠেছে। এখন ধানের ক্ষতির চিন্তা নয়, কোনোমতে রোদে শুকিয়ে গোলায় তোলা গেলেই তারা খুশি।
কৃষকরা আরও জানান, কৃষি বিভাগের লোকজন নাকি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। যদি সত্যি হয়, তা হলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক যেন এই তালিকার আওতায় আসে। তাদের অভিযোগ, কিছু দলীয় নেতারা কৃষকের নামের পরিবর্তে তাদের দলীয় কর্মীদের নাম তালিকাভুক্ত করছেন।
কৃষকদের দাবি, তারা সরকারি প্রণোদনা চান না, তারা চান হাকালুকি হাওড়ে বোরো ধান রক্ষায় বাস্তবসম্মত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
হাকালুকি হাওড় থেকে নৌকায় ধান আনতে দেখা গেল কোরবানপুর গ্রামের আশি বছরের জমির মিয়াকে। হাওড়ের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন তিনি। তার চোখেমুখে রাজ্যের দুশ্চিন্তা। কথা হয় তার সঙ্গে।
আলাপকালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, আগে তো এমন ছিল না। এখন যেন প্রায় প্রতি বছরই কৃষকের স্বপ্ন কেড়ে নেওয়ার জন্য আগাম বন্যা আসে। কত উন্নত জাত, আগাম ফসল! তারপরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় কৃষককে।
/এসএকে