মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে প্রতিনিয়ত চলতে হয়। নানা কর্মের মাঝে ভুলভ্রান্তি হতে থাকে। ক্ষমা না করা হলে সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা ও অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে। যখন আমরা কাউকে ক্ষমা করি, তখন আমরা তাদের বিরুদ্ধে আমাদের নেতিবাচক আবেগগুলোকে ছেড়ে দিই। এটি আমাদের শান্ত এবং মুক্ত বোধ করতে সাহায্য করে।
তাই আমাদের উচিত একে অন্যকে ক্ষমা করে দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা। ক্ষমায় পারস্পরিক সৌহার্দ বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন, ‘ভালো আর মন্দ সমান নয়। উৎকৃষ্ট দিয়ে মন্দকে দূর করো। তখন দেখবে, তোমার আর যার মধ্যে শত্রুতা আছে সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত-৩৪)।
ক্ষমা করা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। ক্ষমা না করা হলে ক্রোধ, রাগ এবং হিংসা জাগ্রত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যেটি মানসিক চাপ এবং উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। ক্ষমা করা এই নেতিবাচক আবেগগুলোকে দূর করতে সাহায্য করে।
ক্ষমা করা আমাদের আরও সহানুভূতিশীল হতে সাহায্য করে। যখন আমরা কাউকে ক্ষমা করি, তখন আমরা তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি দেখতে শিখি। ক্ষমা মানুষকে বিনম্র করে তোলে। আল্লাহর রহমতের নিকটবর্তী করে দেয়। কারণ নম্রতার মাঝে আল্লাহ কল্যাণ রেখেছেন।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যাকে নম্রতা ও বিনয়ের গুণে গুণান্বিত করা হয়েছে, কল্যাণ তার জন্য। আর যার মধ্যে নম্রতা নেই, সে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত’ (তিরমিজি)। ক্ষমা আমাদের একজন শক্তিশালী এবং দৃঢ় ব্যক্তি হতে সাহায্য করে। ক্ষমা না করা হলে আমরা, যারা আমাদের ক্ষতি করেছে তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। ক্ষমা করা আমাদেরকে এই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সাহায্য করে, ক্রোধ নিবারণ করে এবং আমাদের জীবনকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে।
আরবিতে ‘নাস’ অর্থ মানুষ। আরবি ক্রিয়া ‘নাসিয়া’ থেকে ‘নাস’ শব্দের উদ্ভব, যার অর্থ ভুলে যাওয়া। মানুষ ভুলে যায় বিধায় ভুল করে। সঠিক উদ্দেশ্য ভুলে যায় বলেই ভুল কাজের দিকে ধাবিত হয়। মানুষ আল্লাহর আদেশ অমান্য করার মাধ্যমে ভুল করে। মানুষ মানুষের প্রতি অবিচার করার মাধ্যমে ভুল করে। ভুলহীন মানুষ দুনিয়াতে নেই। কাজেই আমাদের প্রত্যেকের উচিত ক্ষমার অভ্যাস গড়ে তোলা। ক্ষমা চাওয়া। ক্ষমা করে দেওয়া। আল্লাহ তায়ালা এমন লোকদেরই পছন্দ করেন। যে ক্ষমা করে আল্লাহ তায়ালাও তাকে ক্ষমা করেন।
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ক্ষমাশীলতার নীতি অবলম্বন করো, সত্য-সঠিক কাজের আদেশ দাও আর জাহিলদের এড়িয়ে চলো।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ১৯৯)
মানুষ দুনিয়াতে একটা উদ্দেশ্যে আসে। সে নিজে আসে না, তাকে পাঠানো হয়। এরপর দুনিয়াতে বিভিন্ন জিনিসের মোহে মানুষ আল্লাহর থেকে দূরে সরে যায়। বিভিন্ন গুনাহে লিপ্ত হয়। পরে হতাশায় জীবন পর্যবসিত হয়। আর আল্লাহ তায়ালা মানুষকে ক্ষমা করতে চান। এ জন্যই তিনি গাফফার, ক্ষমাশীল। তাওয়াব, তওবা কবুলকারী। রহিম, রহমান, দয়াশীল।
তিনি বান্দাকে তাঁর হতাশা থেকে ফিরিয়ে আনতে চান। এ জন্য কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় মানুষকে ফিরে আসার আহ্বান করেছেন এবং ক্ষমার ঘোষণা দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন, ‘বলো হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ- তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।’ (সুরা জুমার, আয়াত : ৫৩)
আল্লাহ তায়ালা ক্ষমাশীল। নিজে ক্ষমা করেন। ক্ষমাশীলদের ভালোবাসেন। এ জন্য রাসুল (সা.) নিজের মাঝে ক্ষমার অভ্যাস গড়ে তুলেছেন এবং মানুষকে ক্ষমার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। আমরা রাসুলের তায়েফে সফর সম্পর্কে জানি। তিনি সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন হেদায়েতের দাওয়াত, মানুষকে কুফরের অন্ধকার থেকে ঈমানের আলোর দিকে আসার দাওয়াত।
কিন্তু তায়েফবাসী তাকে চেনেনি। তাকে শত আঘাতের মাধ্যমে রক্তাক্ত করেছে, কষ্টে জর্জরিত করেছে। কিন্তু তারপরও রাসুল (সা.) তাদের প্রতি আল্লাহর কাছে কোনো অভিযোগ করেননি। উল্টো তাদের হেদায়েতের জন্য দোয়া করেছেন। আশা করেছেন যে হয়তো তাদের পরবর্তী প্রজন্ম ঈমানের ছায়ায় আশ্রয় নেবে। মক্কা বিজয়ের দিনেও ঘোষণা করে দিয়েছিলেন সাধারণ ক্ষমা। নিজের পবিত্র দেহ মোবারক রক্তাক্তকারীদের প্রতি ক্ষমা। আমাদের এসব ঘটনার মাধ্যমে শিক্ষা দিয়ে গেছেন। ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার শিক্ষা। মানুষের প্রতি এহসান করার শিক্ষা।
ক্ষমাকারীকে আল্লাহ ভালোবাসেন। তার সম্মান বাড়িয়ে দেন। লোকদের সম্মুখে তাকে উঁচু করে তুলে ধরেন। মুসলিম শরিফে আবু হুরায়রা থেকে রাসুল (সা.)-এর হাদিস রয়েছে এ বিষয়ে, ‘যে ব্যক্তি ক্ষমা করে আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। আর কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনীত হলে তিনি তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন’ (মুসলিম)।
ক্ষমা, প্রতিশোধ না নেওয়া, নিজের ওপর অন্যের করা অবিচার ও জুলুমের শোধ না নেওয়া বেশ কঠিন কাজ। প্রত্যেকেরই একটা আত্মসম্মান আছে এবং কেউই তাঁর ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন না। কিন্তু ক্ষমার করার মাঝে বহু কল্যাণও নিহিত আছে।
তাই আমাদের ক্ষমা করা উচিত, নিজেদের ক্ষমা পাওয়ার আশায়, আল্লাহর রহমতের নিকটবর্তী হওয়ার আশায়, পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষার নিমিত্তে, দুনিয়া ও আখেরাতের সর্ব ধরনের কল্যাণ অর্জনের আশায়। ক্ষমার অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য আমাদের ধৈর্যশীল এবং সহানুভূতিশীল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো, আর তা আল্লাহভীরু ব্যক্তিবর্গ ছাড়া অন্য সবার কাছে নিশ্চিতভাবে কঠিন’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৪৫)। আল্লাহ সবাইকে বোঝার ও আমল করার তওফিক দিন।
/এসএকে