চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পেতে শিশু-কিশোরদের বয়স জালিয়াতির প্রবণতা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পরিকল্পিতভাবে জন্মনিবন্ধন, শিক্ষা সনদ ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যয়ন ব্যবহার করে একটি অংশ নিজেদের বয়স বাড়িয়ে ভোটার হওয়ার চেষ্টা করছে। এ প্রক্রিয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের কিছু প্রতিনিধির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। ফলে চাপে পড়েছে উপজেলা নির্বাচন অফিস।
উপজেলা নির্বাচন অফিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন শতাধিক আবেদনকারী এনআইডির জন্য অনলাইনে আবেদন করে ছবি তুলতে আসছে। যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে একাধিক ক্ষেত্রে তথ্য গোপন ও জালিয়াতির প্রমাণ মিলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অধিকাংশ আবেদনকারীই প্রকৃত বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পারিবারিক তথ্য গোপন করছে।
বেলগাছি ইউনিয়নের ফরিদপুর গ্রামের এক আবেদনকারী ২০০৮ সালের জন্মতারিখ দেখিয়ে জন্মনিবন্ধন তৈরি করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি পাশের সনদ সংগ্রহ করেছে। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় থেকে প্রত্যয়ন নেওয়ার পর ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও যাচাই ছাড়াই সনদ দেওয়া হয়েছে। আবেদনে বাবার স্বাক্ষর জাল করার বিষয়টিও প্রাথমিক যাচাইয়ে উঠে এসেছে।
একই ধরনের তথ্য গোপনের ঘটনা পাওয়া গেছে কুলপালা গ্রামেও। সেখানে এক আবেদনকারী নিজেকে চতুর্থ শ্রেণি পাশ দেখালেও স্থানীয়ভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। প্রকৃত তথ্য গোপন করে দ্রুত এনআইডি পাওয়ার লক্ষ্যেই এ ধরনের কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুতর অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে বাড়াদি ইউনিয়নের নতিডাঙ্গা গ্রামে। এক ব্যক্তি ভিন্ন নামে দুটি জন্মনিবন্ধন তৈরি করেছেন। একটি নিবন্ধনে জন্মতারিখ ২০১০ এবং অন্যটিতে ২০০৫ উল্লেখ রয়েছে। উভয় নিবন্ধনেই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর রয়েছে এবং দুটি নিবন্ধনই সচল রয়েছে। বিষয়টি জাতীয় তথ্যভাণ্ডারের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে, গাংনী ইউনিয়নে প্রত্যয়নপত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ না করেই স্বাক্ষর দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই স্মারকে একাধিক প্রত্যয়ন দেওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদে যথাযথ যাচাই ছাড়া সনদ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি অল্প বয়সী শিশু শিক্ষার্থীদের বয়স বাড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অনুসন্ধানকালে আরও জানা গেছে, বিদেশ যাওয়ার প্রবণতাই এই জালিয়াতির অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে লিবিয়া হয়ে সমুদ্রপথে ইতালি যাওয়ার ক্ষেত্রে কিশোরদের মধ্যে বয়স বাড়িয়ে এনআইডি করার প্রবণতা বেশি। তবে বাস্তবে অল্প বয়সে গিয়ে কঠোর শ্রমে টিকে থাকতে না পেরে অনেকেই দেশে ফিরে আসছে। কেউ কেউ দালালদের বিরুদ্ধে মামলা করছে, আবার ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্র জানায়, ১৬ বছর পূর্ণ হলে এনআইডির জন্য আবেদন করা গেলেও ভোটার হতে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক। সন্দেহজনক আবেদনকারীদের কাগজপত্র যাচাই করে অসংগতি পাওয়া গেলে আবেদন বাতিল করা হচ্ছে। তবে জন্মনিবন্ধনে ভুল বা জাল তথ্য থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে সব ক্ষেত্রে প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বয়স জালিয়াতি শুধু আইন লঙ্ঘন নয়, এটি জাতীয় তথ্যভাণ্ডারের নির্ভুলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এ অবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে কঠোর যাচাই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনদ প্রদানে জবাবদিহিতা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এ প্রকট সমস্যাটি নির্বাচন অফিসার মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায়ও উপস্থাপন করেছেন। তবুও ইউপি চেয়ারম্যানদের সহযোগিতা মেলেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।
সময়ের আলো/জোই