মূল্যস্ফীতির জাঁতাকল ও স্থবির আয়, মধ্যবিত্তের নিঃশব্দ শ্রেণিচ্যুতি

কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা

সারাদেশ

সকাল আটটা। গাইবান্ধা শহরের পুরাতন বাজারের মাছের আড়তের সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন রফিকুল ইসলাম (৪৮)। তিনি স্থানীয় একটি বেসরকারি স্কুলের

2026-05-06T21:23:47+00:00
2026-05-06T21:23:47+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
মূল্যস্ফীতির জাঁতাকল ও স্থবির আয়, মধ্যবিত্তের নিঃশব্দ শ্রেণিচ্যুতি
কায়সার রহমান রোমেল, গাইবান্ধা
প্রকাশ: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৯:২৩ পিএম 
পুরাতন বাজারের মাছের আড়তের সামনে দাঁড়ানো আছেন রফিকুল ইসলাম। ছবি : সময়ের আলো
সকাল আটটা। গাইবান্ধা শহরের পুরাতন বাজারের মাছের আড়তের সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন রফিকুল ইসলাম (৪৮)। তিনি স্থানীয় একটি বেসরকারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক। আড়তে রুই মাছের কেজি সাড়ে ৩০০ টাকা, যা মাত্র দুই বছর আগেও ছিল ২০০ টাকা। চড়া দামের ভিড়ে শেষ পর্যন্ত ছোট মাছ আর শাক কিনে ভারাক্রান্ত মনে বাড়ির পথ ধরলেন তিনি। 

বুধবার (৬ মে) গাইবান্ধা শহরের পুরাতন বাজারে কথা হয় ক্রেতাদের সঙ্গে।

তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে রফিকুল বললেন, বাজারে এলে এখন বুক কাঁপে। বেতন বাড়েনি, কিন্তু খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। মাসের অর্ধেক যেতেই পকেট শূন্য হয়ে যায়।

রফিকুলের এই হাহাকার কেবল একার নয়, বরং ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও যমুনা বেষ্টিত গাইবান্ধা জেলার হাজারো মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিদিনের রূঢ় বাস্তবতা। মূল্যস্ফীতির লাগামহীন ঘোড়া আর আয়ের স্থবিরতা—এই দ্বিমুখী চাপে পড়ে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার এখন নিম্নবিত্তের কাতারে নেমে যাওয়ার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০২৬ সালের মার্চে জাতীয় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, নির্দিষ্ট আয়ের মানুষরাই এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি দিশেহারা। গাইবান্ধার মতো মফস্বল জেলাগুলোতে করপোরেট বা বিকল্প আয়ের সুযোগ সীমিত হওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ।


শহরের কলেজপাড়ার বাসিন্দা নাসরিন আক্তারের (৪২) স্বামী একটি এনজিওতে কাজ করেন। ২৫ হাজার টাকা বেতনে চারজনের সংসার চালানো এখন তার কাছে পাহাড় ডিঙানোর মতো। তিনি বলেন, বাড়িভাড়া, বাজার খরচ আর সন্তানদের কোচিং ফি দেওয়ার পর সঞ্চয় তো দূরের কথা, প্রতি মাসেই ঋণ করতে হচ্ছে। বড় ছেলের বই কিনতে গিয়ে দেখি দাম গত বছরের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ বেশি।

অন্যদিকে, স্বাস্থ্য খরচের আকস্মিক চাপ অনেক পরিবারকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। শহরের কাপড় ব্যবসায়ী জাহিদুল ইসলাম (৪৫) জানান, স্ত্রীর হার্টের চিকিৎসায় দেড় লাখ টাকা খরচ করতে গিয়ে দোকানের পুঁজি ভেঙেছেন তিনি। সেই ঋণ দুই বছরেও শোধ করতে পারেননি।

মধ্যবিত্তের এই লড়াই শুধু আর্থিক নয়, মানসিকও। সমাজে নিজেদের সম্মান ধরে রাখতে তারা অভাবের কথা কাউকে বলতে পারেন না। কলেজছাত্র রাকিব হাসান বলেন, বাবা সারা জীবন কষ্ট করে আমাদের একটি সম্মানজনক অবস্থানে এনেছেন। এখন যখন দেখি মাসের শেষে তিনি হিসাব মেলাতে পারছেন না, তখন খুব ভয় লাগে—আমরা কি এই অবস্থান ধরে রাখতে পারব?

নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়ে শহরে ঠাঁই নেওয়া মজিবর রহমানের (৫২) মতো মানুষের অবস্থা আরও করুণ। ওষুধের দোকানে ১৪ হাজার টাকা বেতনে কাজ করা মজিবর জানান, গ্রামে ফেরার পথ নেই আর শহরে থিতু হওয়ার সামর্থ্য নেই। তিনি যেন এক অদ্ভুত ‘ত্রিশঙ্কু’ অবস্থায় আটকে আছেন।

সচেতন মহলের মতে, মধ্যবিত্তের এই জায়গাটি এখন দখল করছে প্রবাসী আয়নির্ভর পরিবারগুলো। অন্যদিকে, বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে চাষি না পেলেও সাধারণ ভোক্তাকে তিনগুণ দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। নামকাওয়াস্তে বাজার তদারকি থাকলেও বাস্তবে তার কোনো সুফল মিলছে না।

গাইবান্ধার মধ্যবিত্ত মানুষ বড় বড় উন্নয়নের স্লোগান চান না। তাদের চাওয়া খুবই সামান্য— দ্রব্যমূল্যের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের বাস্তবসম্মত সমন্বয় এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সাশ্রয়ী সুযোগ। রফিকুল ইসলামের ভাষায়, আমরা বিলাসিতা চাই না, শুধু পরিবার নিয়ে সপ্তাহে এক দিন শান্তিতে দুবেলা দু-মুঠো খেয়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা চাই।

এই নিঃশব্দ কষ্ট হয়ত কোনো ডিজিটাল পরিসংখ্যানে সঠিকভাবে ধরা পড়ে না। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে গাইবান্ধার মতো প্রান্তিক জেলাগুলোতে একটি বিরাট জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদি হতাশার দিকে ধাবিত হবে, যা সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

সময়ের আলো/জোই


  বিষয়:   মূল্যস্ফীতি  জাঁতাকল  স্থবির আয়  মধ্যবিত্ত  নিঃশব্দ  শ্রেণিচ্যুতি 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: