তার কণ্ঠ ছিল অদ্ভুত এক মায়াবী শক্তিতে ভরপুর। গায়কীতে তার যেমন ছিল শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরতা, তেমনি ছিল আধুনিক গানের সহজ ও প্রাঞ্জল আবেগ। বিশেষ করে বিষাদ আর প্রেমের আকুতি তার কণ্ঠে যেভাবে মূর্ত হয়ে উঠত, তা সমকালীন আর কোনও শিল্পীর মধ্যে মেলা ভার। উচ্চাঙ্গ সংগীতের তালিম থাকলেও তিনি নিজেকে গণমানুষের গায়ক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তিনি সুবীর নন্দী, দেশের সংগীত জগতের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র। সুরের জাদুকর হিসেবে খ্যাত এই কিংবদন্তি ২০১৯ সালের এই দিনে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তার প্রয়াণে সংগীত জগতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা আজও অপূরণীয়। তবে শরীরী প্রস্থান ঘটলেও দরদমাখা কণ্ঠ আর কালজয়ী গানগুলো তাকে অমর করে রেখেছে কোটি ভক্তের হৃদয়ে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সুবীর নন্দী এক অবিচ্ছেদ্য নাম। চার দশকেরও বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে তিনি আড়াই হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন। তার গাওয়া গান ছাড়া এক সময় ঢাকাই চলচ্চিত্রের পূর্ণতা যেন অসম্ভব ছিল। ‘দিন যায় কথা থাকে’ চলচ্চিত্রের টাইটেল সং গেয়ে তিনি প্রথম ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
সুবীর নন্দীর ভান্ডারে রয়েছে অসংখ্য মণিমুক্তো। তার প্রতিটি গানই যেন এক একটি ছোটগল্প। ‘হাজার মনের কাছে, ‘আমার এ দুটি চোখ’, ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো’, ‘পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা হাসো’, ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার’, ‘পাখি রে তুই দূরে থাকলে’, ‘আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি’সহ অসংখ্য জনপ্রিয় গান রেখে গেছেন এই গুণী শিল্পী। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য সুবীর নন্দী তার জীবদ্দশায় অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। যার মধ্যে একুশে পদক, শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী বিভাগে রেকর্ড পাঁচবার (১৯৮৪, ১৯৮৬, ১৯৯৯, ২০০২ ও ২০১৫) জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর সিলেট জেলার বানিয়াচংয়ে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তার জন্ম। মায়ের কাছেই ছিল গানের হাতেখড়ি। সিলেটের সেই সবুজ প্রকৃতি আর লোকজ সুর তার কণ্ঠে এক সহজাত মেঠো আমেজ যুক্ত করেছিল। তিনি আমৃত্যু ছিলেন সুরের এক নিষ্ঠাবান সাধক।
সুবীর নন্দী নেই, কিন্তু তার গানগুলো আজও বেঁচে আছে। বিষণ্ণ দুপুরে কিংবা জ্যোৎস্না রাতে যখনই কেউ বিরহী সুর খুঁজে ফেরে, সুবীর নন্দীর কণ্ঠই হয়ে ওঠে তার অন্যতম প্রধান আশ্রয়। তিনি চলে গেলেও তার কণ্ঠের জাদু থেকে যাবে চিরদিন। আজকের দিনে সুরের এই মহান বরপুত্রের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। তার সৃষ্টি বেঁচে থাকুক কাল থেকে কালান্তরে।
সময়ের আলো/জেডি