বাংলা গানের দীর্ঘ ও বর্ণিল ভুবনে কিছু মানুষ থাকেন, যাদের উপস্থিতি মঞ্চের আলোয় নয়, বরং শব্দের অন্তর্লোকে। শিল্পী গান গেয়ে শ্রোতার করতালি পান, সুরকার সুরের মায়াজাল বোনেন; আর গীতিকার নীরবে শব্দের ভেতর রেখে যান মানুষের হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, স্বপ্ন-হতাশা আর জীবনের অনুচ্চারিত গল্প।
একটি গান যখন শ্রোতার হৃদয়ে গিয়ে নিঃশব্দে দরজা খোলে, তখন সেই দরজার প্রথম চাবিটি থাকে গীতিকারের হাতে। আর গোলাম মোর্শেদ হলেন সেই চাবিওয়ালা— যিনি তার লেখার জাদুচাবি দিয়ে বহু দরজা খুলেছেন বাংলা গানের ভুবনে। নব্বই দশক থেকে তার লেখা গান বাংলাদেশের শ্রোতাদের কানে কানে ফিরেছে।
গোলাম মোর্শেদের গীতিকবি হয়ে ওঠার গল্পটিও খানিকটা ব্যতিক্রমী। তিনি শুরুতে গান লেখাকে পেশা বা জীবনের লক্ষ্য হিসেবে ভাবেননি। কবিতা পড়তেন, গান শুনতেন; বিশেষ করে লাকী আখান্দের গান তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করত। লাকী আখান্দের উৎসাহেই তার গীতিকবি হিসেবে যাত্রা শুরু। প্রথম দিকের একটি গান ‘ভালোবেসে ভুল ছিল যত, তোমাকে ততখানি ভুলে যাওয়া হলো না আমার’ লাকী আখান্দ মাত্র ৩০ মিনিটে সুর করেছিলেন বলে গোলাম মোর্শেদ নিজেই জানিয়েছেন। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন দেশের প্রখ্যাত শিল্পী সামিনা চৌধুরী।
প্রথম গান প্রকাশের পরপরই গোলাম মোর্শেদের গীতিকবি-পরিচিতিকে আরও দৃঢ় করে তার লেখা গানের প্রথম মিক্সড অ্যালবাম ‘বিতৃষ্ণা জীবন আমার’ অ্যালবামের গানের তালিকা। ১২টি গানের এই অ্যালবামে ব্যান্ড ও আধুনিক গানের মেলবন্ধন ছিল। সুর করেছিলেন লাকী আখান্দ। আর গানগুলোতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, হাসান, কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী ও সামিনা চৌধুরীর মতো শিল্পীরা। এই অ্যালবামের কী করে বললে তুমি,
বিতৃষ্ণা জীবনে আমার, লিখতে পারি না কোন গান, ভালোবেসে চলে যেও না, পথে হলো দেখা, জানি না তো সেসহ আরও বেশ কিছু গান এখনও শ্রোতাদের পছন্দের শীর্ষে থাকে এখনও।
লাকী আখান্দ : শব্দ ও সুরের সখ্য
গোলাম মোর্শেদের গীতিকবি-জীবনের সঙ্গে কিংবদন্তি লাকী আখান্দের নাম এমনভাবে জড়িয়ে আছে, যেন শব্দের পাশে সুরের একটি দীর্ঘ ছায়া। তাদের সম্পর্ক কেবল গীতিকার ও সুরকারের পেশাগত সম্পর্ক ছিল না; ছিল দীর্ঘদিনের সৃজনসঙ্গ। গোলাম মোর্শেদের নিজের বক্তব্যেও লাকী আখান্দের উপস্থিতি বারবার ফিরে আসে। তার জীবনের একটি বড় অংশজুড়ে ছিলেন এই কিংবদন্তি শিল্পী-সুরকার। তাকে ভেবেই অনেক গান লিখেছেন এই গীতিকবি। গোলাম মোর্শেদের গীতিকবি-জীবন নিয়ে কথা বলতে গেলে লাকী আখান্দের প্রসঙ্গ তাই অনিবার্য। তাদের সম্পর্ক কেবল গীতিকার ও সুরকারের পেশাগত সম্পর্ক ছিল না; দীর্ঘ সময়ের সৃজনসঙ্গও ছিল।
গোলাম মোর্শেদের সংগ্রহে তার লেখায় লাকী আখান্দের সুর করা অপ্রকাশিত প্রায় ২০০টি গান রয়েছে। এর কিছু গান পরবর্তী সময়ে ‘গান জানালা’র ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তার সাম্প্রতিক উদাহরণ ‘যার কাছে মন রেখে’। গানটি ১৯৯৮ সালে লাকী আখান্দের জন্য লেখা ও তার সুর করা হয়েছিল। বিভিন্ন কারণে তখন তা প্রকাশ পায়নি। প্রায় ২৮ বছর পর ২০২৬ সালে গানটি তরুণ মুন্সীর কণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে।
নতুন সময়, নতুন শিল্পী
গোলাম মোর্শেদের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ‘গান জানালা’। ২০২২ সালের মাঝামাঝি এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের যাত্রা শুরু হয় মূলত মৌলিক বাংলা গানকে সামনে রেখে। এখানে তিনি শুধু নিজের পুরোনো গানকে পুনরায় সামনে আনেননি; নতুন শিল্পী, নতুন সুরকার ও নতুন সংগীত-প্রযুক্তির সঙ্গে নিজের গীতিকবিতাকে যুক্ত করেছেন এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। এর মধ্য দিয়ে আরেকটা ব্যাপার বোঝার আছে তা হলো— গোলাম মোর্শেদের গীতিকবি-সত্তা শুধু নস্টালজিয়ার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। তিনি পুরোনো সৃষ্টির উত্তরাধিকার বহন করছেন, পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গেও কাজ করছেন।
কেবল ‘জনপ্রিয় গান লেখক’ নয়
গোলাম মোর্শেদের কাছে শ্রোতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সংযোগ তৈরি করাটাই যেন বড়। এই দীর্ঘ পথচলায় তার গানের বিষয় বদলেছে, সুরের ধরন বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে; কিন্তু গীতিকবিতার মূল জায়গাটিতে রয়ে গেছে মানুষের অনুভূতি। সম্ভবত এখানেই গোলাম মোর্শেদের গীতিকবি হিসেবে সবচেয়ে বড় পরিচয়। তিনি নিজেকে কেবল ‘জনপ্রিয় গান লেখক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি; বরং গানকে দেখেছেন অনুভূতি প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে। আর এ কারণেই তার লেখা গান দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজও নতুন কণ্ঠে ফিরে আসে কখনো পুরোনো সুরে, কখনো নতুন সংগীতায়োজনে, কখনো নতুন প্রজন্মের শিল্পীর কণ্ঠে। বাংলা গানের ইতিহাসে তাই গোলাম মোর্শেদের জায়গাটি শুধু জনপ্রিয় গানের গীতিকার হিসেবে দেখলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
গোলাম মোর্শেদের গীতিকবিতার সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এখানেই— তিনি সময়কে অনুসরণ করেননি; বরং সময় তার কিছু গান অনুসরণ করে আজ ও আগামীর অংশ করে নিয়েছে তার মতো করে।
আগামীকাল ২৫ সেপ্টেম্বর এই গুণী গীতিকবির জন্মদিনে রইল শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে