কয়েক দিন ধরে হঠাৎ বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢল বিস্তীর্ণ হাওড় এলাকার ফসলি ক্ষেতের ওপর দিয়ে বয়ে যায়। তাতে করে ওই এলাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। ইতিমধ্যে শুধু সিলেটের চার জেলায় বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। যার পরিমাণ ৬০০ কোটি টাকা। এতে কৃষক দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফসলের যদি ক্ষতি হয় তা হলে শুধু কৃষকই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, দেশের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইতোমধ্যে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী এক দিনের বৃষ্টিতে হাওড় এলাকার কৃষকের স্বপ্ন পাকা ধান ডুবে যায়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওড় এলাকায় জলাবদ্ধতা, বন্যা ও জলচক্রের অস্থিরতা নতুন কিছু নয়। অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে এই অঞ্চলটি বারবার জলমগ্ন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতি শুধু জলবণ্টনের সমস্যা নয়, বরং কৃষি, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার জন্য এক বিরাট অঘটন। এই পরিস্থিতির মূল কারণ হলো দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও পরিকল্পনার অভাব। তবে এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, এনিয়ে সরকারের কিছু প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, সরকারের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি দীর্ঘ সময়ের জন্য ফেলে রাখা হয়েছে, যার ফলে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে ডুবে গেছে, স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে কৃষকের।
দৈনিক সময়ের আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়- প্রকল্পটি সময়মতো বাস্তবায়ন হলে হয়তো কৃষকের এই দুর্দশা এড়ানো যেত। ২০২২ সালে এই প্রকল্পের পরিকল্পনা শুরু হয়, তখন এর ব্যয় ধরা হয় দুই হাজার কোটি টাকার ওপর। লক্ষ্য ছিল ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে এর কাজ শেষ করা। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে কাজের অগ্রগতি ধীর হয়ে যায়। এরপর ২০২৪ সালের আগস্টে ব্যয় কমিয়ে ৭৫০ কোটি টাকায় প্রকল্পের প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়। তার পরের বছরগুলোতেও নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে পড়ে যায় প্রকল্পের অগ্রগতি।
একদিকে পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে ব্যয় কমানোর সুপারিশ, অন্যদিকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেরি ও সংশোধিত প্রস্তাবের জন্য সময় ক্ষেপণ করে। ফলে প্রায় চার বছর ধরে প্রকল্পের অগ্রগতি না হওয়ায় হাওড়ের কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো নদী ড্রেজিং, খাল পুনর্নির্মাণ ও বাঁধ শক্তিশালীকরণ- যা সময়োপযোগী জলবণ্টনের জন্য অপরিহার্য। এতে করে ১৬টি উপজেলায় ৩০৩.৫৮ কিলোমিটার নদী ও খাল খনন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের সংরক্ষণ ও স্বাভাবিক নৌচলাচলের ব্যবস্থা করা হবে। এর ফলে বন্যা ও জলাবদ্ধতা কমে আসবে, ফসলের ক্ষতি কমবে এবং কৃষকের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রায় ১৫ লাখ টন বোরো ধান বন্যার ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এই মহৎ পরিকল্পনাও নানা জটিলতায় পড়ে গেছে। ড্রেজিংয়ের খরচের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে প্রতি ঘনমিটার মাটি উত্তোলনের খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১৯৩ টাকা- যা অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় অনেক বেশি। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, বিস্তারিত ব্যয় ও কার্যক্রমের তথ্য-উপাত্ত স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হবে। ড্রেজিং ছাড়াও উত্তোলিত মাটি কোথায় ও কীভাবে ব্যবস্থাপনা হবে, তারও পরিকল্পনা চাওয়া হবে। এই ধরনের জটিলতাসহ নানা বিষয় এখনও সমাধান হয়নি, ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক ও পরিকল্পনাগত দিক থেকে এই প্রকল্পের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এটি জলবণ্টনে স্থিতিশীলতা আনার পাশাপাশি কৃষি ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনার পরও বাস্তবায়ন না হওয়া, বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও ধানের ক্ষতি, সব মিলিয়ে একটি স্বপ্ন ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে রয়েছে। দ্রুত অনুমোদন ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে এই প্রকল্পের সুফল পেতে এখনই প্রয়োজন উদ্যোগী পদক্ষেপ।
এই প্রকল্প যাতে কাগজে-কলমে না থেকে বাস্তবে পরিণত হয়- এটাই হাওড়াঞ্চলের কৃষক ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষার পর, এই জলসংকটের সমাধান যেন দ্রুত বাস্তবায়ন হয়, সেটাই এখন প্রয়োজনীয়। এই মহৎ উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করছে সরকারের আন্তরিকতা ও পরিকল্পনার স্বচ্ছতার ওপর। কারণ জল থাকলে জীবন থাকে, আর জল না থাকলে স্বপ্নও ডুবে যায়।
সময়ের আলো/জেডি