ইসলামি শরিয়তের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম মহান ইবাদত হলো হজ। হজ এমন এক ফরজ আমল, যার মাধ্যমে বান্দা তার প্রতিপালক আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক অনন্য সুযোগ পায়।
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, ‘মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের হজ করা ফরজ, যারা সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে’ (সুরা আলে ইমরান : ৯৭)। হজ আদায়ের ক্ষেত্রে কায়িক ও আর্থিক- উভয় ধরনের সামর্থ্য অপরিহার্য; এ দুটির কোনো একটি অনুপস্থিত থাকলে হজ ফরজ হয় না। হজে গমন কেবল একটি ভ্রমণ নয়, বরং এটি এক গভীর আত্মিক যাত্রা। মক্কায় রওনা হওয়ার আগে একজন হাজিকে বাহ্যিক প্রস্তুতির পাশাপাশি অন্তর পরিশুদ্ধির দিকেও সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হয়।
ইহরাম, ভিসা, নিবন্ধন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এসব জাগতিক প্রস্তুতির চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়তের শুদ্ধতা। রিয়া, খ্যাতিলাভ বা অহংকার যেন উদ্দেশ্য না হয়, এ বিষয়ে সতর্ক থাকা আবশ্যক। একান্তভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হজ আদায় করাই প্রকৃত ইবাদতের চেতনা।
হজ ফরজ হওয়ার জন্য কয়েকটি মৌলিক শর্ত রয়েছে। প্রথমত মুসলিম হওয়া। দ্বিতীয়ত সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হওয়া। তৃতীয়ত বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। চতুর্থত স্বাধীন হওয়া এবং শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম হওয়া। এসব শর্ত পূরণ হলেই হজ আদায় করা ফরজ হয়ে যায়। হজের বিধানগুলো ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নত এই তিন ভাগে বিভক্ত।
হজের ফরজ তিনটি- ১. ইহরামের নিয়ত করা। ২. ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা। ৩. কাবাঘর তওয়াফ করা। এই ফরজগুলোর কোনো একটি বাদ পড়লে হজ আদায় সম্পূর্ণ হয় না। ওয়াজিবগুলোর মধ্যে রয়েছে- মুজদালিফায় অবস্থান, সাফা-মারওয়া সায়ি করা, নির্দিষ্ট দিনে শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ, কুরবানি (তামাত্তু ও কিরান হজে), মাথা মুণ্ডন বা চুল কাটা এবং বিদায়ি তওয়াফ। প্রতিটি আমলই গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এবং আল্লাহর আনুগত্যের প্রতীক।
হজ মূলত একটি কঠোর আত্মিক প্রশিক্ষণ। এখানে একজন মুসলিম ধৈর্য, সংযম, ত্যাগ এবং আনুগত্যের শিক্ষা লাভ করে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিধান পালনের মাধ্যমে সে নিজেকে আল্লাহর হুকুমের প্রতি সম্পূর্ণভাবে সমর্পিত করে তোলে। দেহ ও সম্পদের ব্যয়- উভয়ের মাধ্যমে হজ সম্পন্ন হয়, যা বান্দার আন্তরিকতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
এই ইবাদতের মাধ্যমে মানুষ তার অতীতের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করে। গুনাহে নিমজ্জিত ব্যক্তি পায় নতুন সূচনা, আর সৎকর্মশীল ব্যক্তি লাভ করে আল্লাহর আরও নৈকট্য।
হজ জীবনে একবারই ফরজ। তাই সামর্থ্য অর্জিত হলে দেরি না করে তা আদায় করা উচিত। হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে, ‘যার ওপর হজ ফরজ হয়েছে, অথচ সে তা আদায় করেনি, সে চাইলে ইহুদি বা খ্রিস্টান হয়ে মরুক’ (জামে তিরমিজি : ৮১২)। হজ কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়, এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের এক মহামিলন।
আরাফাতের প্রান্তর ও কাবার চত্বরে ধনী-গরিব, সাদা-কালো, আরব-অনারব সব ভেদাভেদ বিলীন হয়ে যায়। সবার গায়ে এক সাদা পোশাক, সবার কণ্ঠে একই তাওহিদের ধ্বনি। এ দৃশ্য ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও বিশ্বজনীনতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। হজ আমাদের শেখায় মানুষে মানুষে বিভেদ নয়, বরং ঐক্যই ইসলামের মূল শিক্ষা। এটি এমন এক মহান সমাবেশ, যেখানে আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও ভ্রাতৃত্বের বাণী প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হয়।
সময়ের আলো/জেডি