দশটি বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা। অনেক মানত আর প্রার্থনার পর যখন কোলজুড়ে সন্তান আসার বার্তা এল, তখন নড়াইল সদর উপজেলার মাইজপাড়া ইউনিয়নের কালুখালী গ্রামের সালমা-মহসিন দম্পতি যেন ফিরে পেয়েছিলেন হারানো স্বপ্ন। কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! যে ঘরে আনন্দের জোয়ার বইবার কথা ছিল, সেখানে এখন শুধুই নিস্তব্ধতা আর স্বজনদের আহাজারি। একে একে পৃথিবীর আলো দেখল সাতটি নবজাতক, কিন্তু কাউকেই বাঁচানো গেল না।
দশ বছর আগে কালুখালী গ্রামের লতিফ মোল্যার ছেলে মহসিন মোল্যার সঙ্গে বিয়ে হয় সালমার। দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে তিন বছর আগে দেশে ফিরে মহসিন ইজিবাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। দাম্পত্য জীবনের দীর্ঘ খরা কাটিয়ে যখন সালমা অন্তঃসত্ত্বা হলেন, চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন তার গর্ভে রয়েছে ছয়টি সন্তান। কিন্তু প্রসবের সময় বিস্ময় জাগিয়ে একে একে জন্ম নেয় সাতটি শিশু- চার ছেলে ও তিন মেয়ে। তবে অপরিপক্ব অবস্থায় জন্ম নেওয়া এই শিশুদের কেউই বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারেনি।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার সালমার প্রসব বেদনা শুরু হলে তাকে যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মঙ্গলবার রাতে প্রথম ও দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম হয়, যারা জন্মের কিছুক্ষণ পরই মারা যায়। বুধবার রাতে জন্ম নেয় আরও পাঁচটি শিশু। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে একে একে নিভে যায় সাতটি প্রাণের প্রদীপ।
যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ইলা মণ্ডল জানান, শিশুগুলো অত্যন্ত অপরিপক্ব অবস্থায় ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। মাত্র পাঁচ মাস বয়সে জন্ম নেওয়া এই নবজাতকদের গড় ওজন ছিল মাত্র ২০০ গ্রাম। হার্টবিট থাকলেও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সবটুকু প্রয়োগ করেও তাদের বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।
বৃহস্পতিবার সকালে কালুখালী গ্রামে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। নিজ হাতে সাতটি শিশুর দাফন সম্পন্ন করেন তাদের দাদা লতিফ মোল্যা। অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, নিজের হাতে এতগুলো ছোট প্রাণকে কবর দেওয়া যে কত কষ্টের, তা কাউকে বলে বোঝাতে পারব না। দশ বছর পর আশার আলো দেখেছিলাম, কিন্তু আল্লাহ আমাদের নিরাশ করলেন।
/কহু