সীমান্ত পেরিয়ে বিশ্বজয়ের গল্প, অদম্য অ্যাথলেট শিল্পী আখতারের উত্থান

এসকে দোয়েল, পঞ্চগড়

সারাদেশ

দেশের মানচিত্রের একেবারে শেষপ্রান্ত, হিমালয় বিধৌত উত্তরের জনপদ তেঁতুলিয়া। তিনদিকে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা এই জনপদটি এখন আর কেবল

2026-05-08T15:15:06+00:00
2026-05-08T15:15:06+00:00
 
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
সীমান্ত পেরিয়ে বিশ্বজয়ের গল্প, অদম্য অ্যাথলেট শিল্পী আখতারের উত্থান
এসকে দোয়েল, পঞ্চগড়
প্রকাশ: শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬, ৩:১৫ পিএম 
অ্যাথলেট শিল্পী আখতার। ছবি : সময়ের আলো
দেশের মানচিত্রের একেবারে শেষপ্রান্ত, হিমালয় বিধৌত উত্তরের জনপদ তেঁতুলিয়া। তিনদিকে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা এই জনপদটি এখন আর কেবল ভূ-প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত নয়, বরং সীমান্তের অদম্য মেয়েদের ক্রীড়া নৈপুণ্যের কারণে দেশজুড়ে সমাদৃত।

দারিদ্র্যের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যে ক’জন নারী ক্রীড়াবিদ বিদেশের মাটিতে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়েছেন শিল্পী আখতার তাদের মধ্যে অন্যতম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায়ে উত্থান
তেঁতুলিয়ার সীমান্তঘেঁষা শারিয়াল জোত গ্রামের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম শিল্পী আখতারের। বাবা আব্দুল কুদ্দুসের অভাবের সংসারে বড় হলেও শিল্পীর স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। ২০০৩ সালে তেঁতুলিয়ার নারী শিক্ষার অগ্রদূত ‘কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে’ ভর্তির মাধ্যমেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। সেখানে তিনি পান তার জীবনের পথপ্রদর্শক এবং খেলোয়াড় গড়ার কারিগর আবুল হোসেন স্যারকে। আবুল স্যারের নিবিড় তত্ত্বাবধানে শুরু হয় শিল্পীর কঠিন কঠোর পরিশ্রম ও নিরলস অনুশীলন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্যের জয়রথ
২০০৯ সালে জাতীয় পর্যায়ে যাত্রা শুরু করার পর শিল্পী আখতারকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১০ সালে ভারতের হলদিয়াতে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ানশিপে বাংলাদেশ নারী হ্যান্ডবল দলের হয়ে চ্যাম্পিয়ান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। এটিই ছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম বড় সাফল্য।


২০১২ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত আইএইচএফ অনূর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দলের অধিনায়কত্ব করেন শিল্পী। তার নেতৃত্বে দল রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এরপর ২০১৪ সালে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হ্যান্ডবল টুর্নামেন্টে ব্রোঞ্জ পদক জয় এবং ২০১৫ সালের সাউথ এশিয়ান গেমসে (এসএ গেমস) রানার্সআপ হয়ে দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনেন তিনি।

সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত থাকে পরবর্তী বছরগুলোতেও। ২০১৮ সালে ভারতের লক্ষ্ণৌতে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে সহ-অধিনায়ক হিসেবে দলকে ব্রোঞ্জ পদক জেতান তিনি। সর্বশেষ ২০১৯ সালে নেপালে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান গেমসে (এসএ গেমস) জাতীয় সিনিয়র টিমের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং দলকে ব্রোঞ্জ পদক উপহার দেন।

ঘরোয়া ক্রিকেটে একাধিপত্য
কেবল আন্তর্জাতিক অঙ্গনেই নয়, দেশের ঘরোয়া হ্যান্ডবলেও শিল্পী ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। ২০০৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত টানা ১১ বছর বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) হয়ে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ান হওয়ার বিরল কৃতিত্বের অংশীদার তিনি। মাঠের পারফরম্যান্সে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।

পেছনের কারিগর ও বর্তমান জীবন
নিজের এই দীর্ঘ ও গৌরবময় পথচলার পুরো কৃতিত্ব শিল্পী দিয়েছেন তার কোচ আবুল হোসেন স্যারকে। শিল্পী বলেন, আমার শিক্ষাগুরু আবুল হোসেন স্যার না থাকলে হয়তো আজকের এই শিল্পী তৈরি হতো না। তার অক্লান্ত পরিশ্রম আর অনুপ্রেরণাই আমাকে সাধারণ এক গ্রাম্য মেয়ে থেকে জাতীয় দলের অধিনায়ক বানিয়েছে।

বর্তমানে শিল্পী আখতার ঢাকার মালিবাগের একটি স্বনামধন্য ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শরীরচর্চা শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি এখন গড়ে তুলছেন আগামীর খেলোয়াড়দের। পাঁচ বছরের মেয়ে আসফিয়া ওয়ানিয়া খান আয়াত নিয়ে থাকছেন ঢাকায়।

তেঁতুলিয়ার কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে শিল্পীর মতো অর্ধ শতাধিকেরও বেশি কৃতী খেলোয়াড় তৈরি হয়েছে, যারা হ্যান্ডবল, কাবাডি ও শুটিংয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদান রাখছেন। শিল্পীর এই গল্প কেবল একজন খেলোয়াড়ের নয়, বরং এটি প্রান্তিক জনপদের হাজারো মেয়ের স্বপ্ন জয়ের অনুপ্রেরণা। কাঁটাতারের বেড়া যাদের স্বপ্নকে বন্দি করতে পারেনি, শিল্পী আখতার তাদেরই এক সার্থক প্রতিনিধি।

প্রতিষ্ঠানটির অবসরপ্রাপ্ত শরীরচর্চা শিক্ষক ও খেলোয়াড় গড়ার কারিগর আবুল হোসেন বলেন, শিল্পী আখতার আমার ছাত্রী ছিল। কঠোর পরিশ্রম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছে। তার এই সাফল্যে আমি গর্ববোধ করি। ভবিষ্যতে সে আরও ভালো করবে—এটাই আমার প্রত্যাশা ও শুভকামনা।

তেঁতুলিয়ার কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ ইমদাদুল হক বলেন, নানা প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতাকে জয় করে আমাদের মেয়েরা ধারাবাহিকভাবে সাফল্য অর্জন করছে। শিল্পী আখতার তাদেরই একজন উজ্জ্বল উদাহরণ। শিল্পীদের মতো সীমান্তের খেলোয়াড়দের সাফল্যে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গৌরব ও সম্মান অর্জন করেছে।

সময়ের আলো/জোই



  বিষয়:   সীমান্ত  বিশ্বজয়  অদম্য অ্যাথলেট  শিল্পী আখতার  উত্থান 


Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: