জ্যৈষ্ঠ মাস এখনও শুরু হয়নি। অথচ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বিভিন্ন বাজারে ইতোমধ্যেই বিক্রি হচ্ছে অপরিপক্ব লিচু। আকারে ছোট, স্বাদে টক এবং রাসায়নিক ব্যবহার করে পাকানো এসব লিচু নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা। অন্যদিকে চাষিদের দাবি, ঝড়-তুফানে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে লোকসান এড়াতেই তারা আগাম লিচু বাজারজাত করছেন।
শুক্রবার ( ৮ মে ) কসবা পৌর শহরের বিভিন্ন মোড়ে অপরিপক্ব লিচু বিক্রি করতে দেখা যায়। এই লিচু দেখে অনেকেই আগ্রহ করে কিনছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, আগাম লিচু বিক্রি করলে দাম একটু বেশি পাওয়া যায়। তাই তারা বেশি লাভের আশায় আগেভাগে বাগান থেকে এই লিচু সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন।
অন্যদিকে রাবেয়া মান্নান ভুঁইয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বর্তমানে বাজারে ছোট ছোট বিভিন্ন সাইজের লিচু বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। এখনও জ্যৈষ্ঠ মাসই আসেনি। জ্যৈষ্ঠের আগে লিচু কল্পনাও করা যায় না। বাজারে যে-সব লিচু বিক্রি হচ্ছে, সেগুলোতে রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে। শিশুরা না বুঝেই অভিভাবকদের কাছে আবদার করে এসব লিচু খেতে চাইছে। অপরিপক্ব লিচু খাওয়ার কারণে তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তিনি এ বিষয়ে কৃষি বিভাগ ও প্রশাসনের নজরদারি বৃদ্ধির দাবি জানান।’
তবে সন্তানের আবদারে বাধ্য হয়ে লিচু কিনেছেন এমন ক্রেতার সংখ্যাও কম নয়। এক ক্রেতা বলেন, ‘৩০০ টাকা দিয়ে এক আঁটি লিচু কিনেছি। বিক্রেতা বলেছে মিষ্টি হবে। আমি এখনও খাইনি, তবে বাচ্চারা কান্নাকাটি করছিল বলে কিনে দিয়েছি।’
কসবা বাজারের লিচু বিক্রেতা মিন্টু বলেন, ‘আমরা প্রায় ১৫ দিন ধরে লিচু বিক্রি করছি। এগুলো সব রাঙামাটি থেকে আনা। আমাদের এলাকার লিচু বাজারে আসতে এখনও কিছুদিন সময় লাগবে।’
তিনি দাবি করেন, পাহাড়ি এলাকায় সঠিক পরিচর্যার অভাবে লিচুগুলো আকারে ছোট হয়ে থাকে।
এদিকে এক লিচু বাগান মালিক মাসুদ মিয়া বলেন, ‘একটি গাছে সব লিচু একসাথে পাকে না। কিছু কাঁচা থাকে, কিছু পাকে আবার বাদুড় ও পাখির আক্রমণেও ব্যাপক ক্ষতি হয়। আইনি কারণে গাছে জাল ব্যবহার করা যায় না। ফলে অনেক সময় বাধ্য হয়েই আংশিক পাকা লিচু বাজারজাত করতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবার ঝড়-তুফানে আমাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। লোকসান কমাতেই আগাম লিচু বাজারে আনতে হচ্ছে।’ সরকারি সহায়তারও দাবি জানিয়েছেন এই ব্যবসায়ী।
কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইউনানি ও পুষ্টিবিষয়ক চিকিৎসক ইমন হোসেন বলেন, ‘অপরিপক্ব যে-কোনো ফলই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সময়ের আগে ফল পাকাতে রাসায়নিক ব্যবহার করতে হয়। বিশেষ করে শিশুরা এসব ফল দেখে আকৃষ্ট হয় এবং অভিভাবকদের কিনতে বাধ্য করে।’
তিনি বলেন, ‘লিচু একটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ফল। পরিপক্ব অবস্থায় এতে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল থাকে। কিন্তু অপরিপক্ব অবস্থায় এবং রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। শিশুদের হার্ট, ফুসফুস ও পাকস্থলী পুরোপুরি পরিণত না হওয়ায় তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।’
কসবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আয়শা আক্তার বলেন, ‘বাজারে যে-সব লিচু দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে সেগুলো এখনও অপরিপক্ব। একটি ফল প্রাকৃতিকভাবে পাকতে নির্দিষ্ট সময় প্রয়োজন হয়। আগাম বাজার ধরতে গিয়েই চাষিরা ফল সংগ্রহ করছেন। এতে ভোক্তারা লাভের চেয়ে ক্ষতির মুখেই বেশি পড়ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘লিচুর ভেতরে এখনও পর্যাপ্ত সুক্রোজ তৈরি হয়নি, ফলে কাঙ্ক্ষিত মিষ্টতাও আসেনি। আমি মনে করি, এভাবে আগাম বাজারজাত করা উচিত নয়। ভোক্তাদেরও আরও কিছুদিন অপেক্ষা করে পরিপক্ব লিচু খাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এবং লিচু চাষিদের উদ্দেশে বলেন, ‘সঠিক সময়ে লিচু বাজারজাত করলে চাষি ও ভোক্তা, উভয়েই উপকৃত হবেন।’
/এসএকে