ঝালকাঠিতে দেশি গরু পালন করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন স্থানীয় খামারিরা। বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন বা চাকরির অনিশ্চয়তার পেছনে না ছুটে জেলার অনেক শিক্ষিত যুবক এখন গবাদিপশু পালনেই খুঁজে পেয়েছেন আয়ের নতুন পথ। দেশীয় পদ্ধতিতে গরু হৃষ্টপুষ্ট করে তারা যেমন লাভবান হচ্ছেন, তেমনি জেলার মাংসের চাহিদাও পূরণ করছেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, এ বছর জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ হাজার ২৩৪টি। বিপরীতে খামারিদের কাছে প্রস্তুত রয়েছে ৩০ হাজার ৫৮৮টি পশু। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ৩৫৪টি পশু বেশি রয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলায় মোট খামারের সংখ্যা ১ হাজার ৫৩৫টি। এর মধ্যে ১৬৩টি নিবন্ধিত এবং ১ হাজার ৩৭২টি অনিবন্ধিত। কোরবানিকে সামনে রেখে এখন সব খামারেই চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা।
সদর উপজেলার খামারি মো. খলিল রহমান ও মো. ইয়াছিন জানান, প্রবাস জীবন বা অন্য চাকরির অনিশ্চয়তার চেয়ে পশুপালনে তারা বেশি স্বস্তি ও লাভ খুঁজে পেয়েছেন। একটি গরু দিয়ে খামার শুরু করলেও বর্তমানে তাদের খামারে ২০ থেকে ২২টি উন্নত জাতের গরু রয়েছে।
খামারিরা বলেন,‘আমরা ক্ষতিকর ইনজেকশন বা হরমোন ব্যবহার করি না। খৈল, ভুষি, ঘাস ও খড়ের মতো প্রাকৃতিক খাবার দিয়েই গরু পালন করছি। ভারতীয় গরুর অনিশ্চয়তা এবং দেশি গরুর প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ায় এবার ভালো দাম পাওয়ার আশা করছি।’
একই চিত্র দেখা গেছে নলছিটি উপজেলার আজিমপুর এলাকার খামারি বাহাদুর শিকদারের খামারে। তিনি জানান, গো-খাদ্যের দাম বাড়লেও দেশি গরুর রোগবালাই তুলনামূলক কম এবং বাজারে এর চাহিদাও বেশি। ফলে প্রান্তিক খামারিরা লোকসানের ঝুঁকি থেকে অনেকটাই রক্ষা পাচ্ছেন। আগে বাইরের জেলার পশুর ওপর নির্ভরশীলতা থাকলেও এখন স্থানীয়ভাবেই চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটি প্রশিক্ষণ ও সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে অনেক বেকার যুবককে উদ্যোক্তা হতে সহায়তা করছে।
সফল উদ্যোক্তা মো. সাইদুল মল্লিক বলেন,
‘বিদেশে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে একটি গাভি কিনে খামার শুরু করি। বর্তমানে আমার খামারে ১৭টি কোরবানিযোগ্য গরু রয়েছে।’
জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘ঝালকাঠির যুবকেরা এখন অনেক সচেতন। তারা দালালের পেছনে টাকা নষ্ট না করে প্রশিক্ষণ নিয়ে গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। আমরা ঋণ ও কারিগরি সহায়তার মাধ্যমে তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছি, যা জেলার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নীরোদ বরণ জয়ধর বলেন, ‘ঝালকাঠিতে দেশি গরু পালনে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। খামারিরা বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক উপায়ে পশু হৃষ্টপুষ্ট করছেন। জেলার ১ হাজার ৫৩৫টি খামার নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। কোরবানি উপলক্ষে পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম মাঠে কাজ করবে।’
জেলায় প্রস্তুত থাকা ৩০ হাজার ৫৮৮টি পশুর মধ্যে রয়েছে ৯ হাজার ৮০৮টি ষাঁড়, ৮ হাজার ৮৭০টি বলদ, ১ হাজার ৭৭৪টি গাভি, ১৩৯টি মহিষ, ৯ হাজার ৯৬৫টি ছাগল এবং ৩২টি ভেড়া।
স্থানীয় খামারিদের দাবি, অবৈধভাবে ভারতীয় গরু আসা বন্ধ থাকলে তারা তাদের পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং ভবিষ্যতে খামারের সংখ্যা আরও বাড়বে।
/এসএকে