চার বিয়েকে কেন্দ্র করে আন্দোলন গড়ে তোলা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা নয়। বরং এটি প্রান্তিকতা ও গোঁড়ামির বহিঃপ্রকাশ। শরিয়ত শুধু হুকুমের নাম নয়, এর একটি মানবিক মেজাজও রয়েছে। বহুবিবাহ বৈধ হলেও তা প্রচারণা, ভোগবাদ বা ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণের হাতিয়ার বানানো ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ আদর্শের পরিপন্থি। বিশেষ করে স্ত্রীর কষ্ট, মানবিকতা ও নৈতিকতাকে উপেক্ষা করে এমন আচরণ মেজাজে শরিয়তের বিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন রামপুরার মসজিদে আয়েশার খতিব মুফতি আবুল ফাতাহ কাসেমি।
ফেসবুক এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘ এক হলো, শরিয়ত। আরেকটি হলো, মেজাজে শরিয়ত। ইসলামে প্রাজ্ঞ ব্যক্তি এ উভয়টি ধারণ করেন। এ উভয়টি ধারণ করলেই কেবল প্রকৃত আলেম বা বলতে পারি প্রকৃত মানুষ হওয়া যায়।
ইসলামের তত্ত্ব ও হুকুমগত উপাদানকে শরিয়ত বলে। আর মানবীয় চাহিদার আলোকে ইসলাম মানাকে মেজাজে শরিয়ত বলে।
তাই ইসলাম হলো, একই সাথে আকিদা ও আমল, প্রত্যয় ও বাস্তবায়ন, চরিত্র ও নৈতিকতা, আবেগ ও উপলব্ধি, সচেতনতা ও সুরুচিতার মিশ্রণে সমন্বিত এক ধর্মের নাম।
ইসলামে একচেটিয়া বিচ্ছিন্ন রুখসতকে ধারণ করলে তা আর ইসলাম থাকে না। যেমন:
১. চারটা বিয়ে ইসলামে বৈধ। রুখসত। তার মানে চারটা বিয়ের আন্দোলন করা ইসলাম নয়। প্রান্তিকতা। গোঁড়ামি। এটা শরিয়তের মেজাজ না।
২. ফুর্তি করা বৈধ, কিন্তু আপনার বাবার জানাযার নামাজ পড়ে এসে বন্ধুদের নিয়ে ফুর্তি করলেন। এটা শরিয়তের মেজাজ না।
৩. মাসনা আপনার জন্য যে কোনো সময় শর্ত ও প্রয়োজন সাপেক্ষ বৈধ; কিন্তু স্ত্রী সন্তান সম্ভবা অবস্থায় ঢোল পিটিয়ে মাসনা করা অবিবেচনাপ্রসূত বিচ্ছিন্ন ইসলাম। গোঁড়ামি। এটা মেজাজে শরিয়ত না।
৪. ফ্যাসিস্ট আমলের এক এমপি সম্পর্কে জানতাম, তিনি স্কুল কলেজের কোনো অনুষ্ঠানে গেলে দরিদ্র পরিবারের কোনো মেয়ে পছন্দ হলে ‘ভালো’ টাকা পয়সা খরচ করে বিয়ে করে কয়েক মাস হানিমুনে ঘুরে ফ্ল্যাট ইত্যাদি মেয়ের নামে লেখে দিয়ে তালাক দিয়ে দিতেন। এভাবে যৌন লালসা পূরণ করতেন। তো বাহ্যিকভাবে-এ বিয়ে বৈধ হলেও এটা ইসলাম না। এটা ইসলামের মেজাজ না।
মেজাজে শরিয়তের চাহিদা হলো, প্রতিটি হৃদয় ‘কলবুন সালিম’ হবে। বিশুদ্ধ হৃদয় ও বদ আখলাকের ঊর্ধ্বে উঠবে। নৈতিকতার ক্ষেত্রে ইসলাম মানুষের মধ্যে দুটো বিষয়ের চূড়ান্ত বিকাশ দেখতে চায়।
এক. ইসার তথা অন্যের প্রয়োজন ও চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়া। অর্থনৈতিক বিষয় হোক বা আশা আকাঙ্ক্ষার বিষয়ে হোক।
দুই. মানবিকতা।
বাজারি বক্তা রফিকুল ইসলামের স্ত্রী সন্তান সম্ভবা অবস্থায় রেখে দ্বিতীয় বিয়ে ইসলামের মেজাজের সম্পূর্ণ খেলাপ। এরা এদের চাহিদাকে ইসলামের নামে চালিয়ে দেয়।
আমার দ্বিতীয় সন্তান হওয়ার সময় রাত তিনটায় আমার শাশুড়ি বিষণ্ন স্বরে আমাকে জাগিয়ে বললেন, ফাতাহ! নামাজে দাঁড়াও। ইতোমধ্যে শ্বশুর বাড়ির নারীদের অনেকে সেজদায় পড়ে গেছেন। আমি হন্তদন্ত হয়ে নামাজে দাঁড়ালাম। আর পাশের রুম থেকে আমার স্ত্রীর কান্নার আওয়াজে আমার হাত পা অবস হয়ে আসছিল। পরে যখন তার চেহারা দেখলাম, মনে হলো মৃত্যুর কোল থেকে ফিরে এসেছে। মাথায় হাত রাখতেই বেচারি অন্যরকম প্রশান্তি অনুভব করল।
বাজারি এ বক্তার এসব কাণ্ড দেখে অনেক দিন পর আমার স্ত্রীর কষ্টের কথা মনে পড়ল।
বক্তা, আলেম, শায়খুল হাদিস বা মুফতি হওয়া সহজ। কিন্তু মানুষ হওয়া অনেক কঠিন। আসুন, বক্তা হওয়ার আগে মানুষ হই।
/এসএকে