হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলায় নির্মাণাধীন ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও মডেল মসজিদ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রায় সাড়ে ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, দীর্ঘসূত্রতা এবং তদারকির অভাব নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজের ৬০ শতাংশ টাকা উত্তোলন করে নিয়েছে বলে জানা গেছে। এদিকে খোদ গণপূর্ত অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী কাজের নিম্নমান ও ত্রুটিবিচ্যুতির কথা স্বীকার করেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে নিম্নমানের বালু, মার্বেল টাইলস ও ইট। এসব সামগ্রীর গুণগত মান নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী স্থানীয় প্রশাসন। অভিযোগ রয়েছে, কাজের মান ঠিক রাখতে কোনো ধরনের কঠোর তদারকি নেই, ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইচ্ছেমতো নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করছে। এতে করে ভবিষ্যতে স্থাপনার স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে একদফা মার্বেল টাইলস ভেঙে ফেলা হয়েছে। পরবর্তীতে যে মার্বেল টাইলস বসানো হয়েছে সেটিও নিম্নমানের বলে জানা গেছে। ব্লক ইটের মধ্যে দেশীয় ইট ব্যবহার করা হয়েছে। ওয়াল প্লাস্টারে পলিমাটি সমৃদ্ধ বালু ব্যবহার করা হচ্ছে।
লাখাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিয়মের অভিযোগ আমলে নিয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। পরে তিনি গণপূর্ত অধিদফতরের কাছে চলতি বছরের ১৫ মার্চ এবং ১৫ এপ্রিল দুটি পৃথক পত্র পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে। পত্রগুলোতে নির্মাণকাজের অনিয়ম, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার এবং ধীরগতির বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট দফতর এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এতে করে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়ছে।
অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদফতর বলছেন, তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজের গুণগতমান নিয়ে সতর্ক করেছেন। যদি শিডিউল অনুযায়ী কাজের গুণগত মান সঠিক না করে, তবে তারা মসজিদ গ্রহণ করবেন না।
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ‘টিবিএল অ্যান্ড আইসি এমসিএল জেভি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি শুরু থেকেই ধীরগতিতে কাজ চালিয়ে আসছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সাত বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে। ইতোমধ্যে আরেকদফা দফা সময় বাড়ানো হলেও কাজের গতি ‘কচ্ছপ গতি ’ মতোই রয়ে গেছে।
নির্মাণ কাজের সাব ঠিকাদার এজিবুল মিয়া জানান, কাজ কখন শেষ হবে সেটা মুল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভর করছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমাদেরকে যেভাবে কাজ করতে বলছে আমরা সেভাবে কাজ করছি।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একটি ধর্মীয় ও সামাজিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থাপনা হিসেবে মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নির্মাণকাজে এমন অনিয়ম অত্যন্ত দুঃখজনক। তারা দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কাজের মান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তারা প্রকল্পটি দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে নির্মাণকাজের সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হেমায়েত উল্লাহ জানান, আমরা শিডিউল অনুযায়ী কাজ করছি। গণপূর্ত সব সময় আমাদের কাজের তদারকি করছে।
লাখাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ মুরাদ ইসলাম সময়ের আলোকে জানান, আমি উপজেলা ইঞ্জিনিয়ারসহ তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। এতে দেখা গেছে- খুবই নিম্নমানের মার্বেল টাইলস, বালু ও ইটের মান খুবই খারাপ। পরবর্তীতে বিষয়টি গণপূর্ত লিখিতভাবে অবগত করলেও তারা কোনো উত্তর দেয়নি।
হবিগঞ্জ গণপূর্ত অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কামরুল হাছান সময়ের আলোকে জানান, আমরা মসজিদের নির্মাণকাজ নিয়মিত তদারকি করেছি। ইতোমধ্যে বেশ কিছু ত্রুটি পেয়েছি। সেগুলো সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সংশোধন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি। আমরা কাজের কোয়ালিটির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের আপস করব না।
সচেতন মহলের মতে, সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অনিয়ম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। যথাযথ নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে প্রকল্পের গুণগত মান ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করা এখন সময়ের দাবি।
সময়ের আলো/জোই