শুরু হয়েছে পবিত্র হজব্রত পালনের মৌসুম। আরবি বা হিজরি তারিখ মতে, প্রতি বছর এই সময়ে পুণ্যভূমি মক্কা ও অন্যান্য নির্দিষ্ট অংশে, নির্ধারিত সময় ও দিনক্ষণে, নির্ধারিত কতগুলো আমলের সমষ্টিই হচ্ছে হজ পালন। এখন চলছে সেই হজের মৌসুম। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলপ্রেমী বহু ধর্মপ্রাণ মুসল্লি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইতিমধ্যে পুণ্যভূমি মক্কা ও মদিনা জিয়ারতের উদ্দেশ্যে পৌঁছে গেছেন সৌদি আরবে। কেউ বা শুরু করেছেন হজের আনুষ্ঠানিক পালনীয় অনেক বিধানাবলিও। যে আমলগুলো ধারাবাহিকভাবে চলবে জিলহজের প্রথম দশ দিন পর্যন্ত।
হজ আরবি শব্দ। অভিধান মতে হজ অর্থ- ইচ্ছা করা, গমন করা এবং আরব দেশের পুণ্যভূমি পবিত্র মক্কা ও হজের জন্য নির্দিষ্ট অংশে যেমন আরাফায় অবস্থান করা ইত্যাদি। নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্টভাবে সম্পন্ন করে সমাবেশভিত্তিক মুসলমানদের (ইবাদতের মধ্য থেকে) অন্যতম প্রধান একটি ইবাদত হচ্ছে এই পবিত্র হজব্রত পালন করা। ইসলামের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিধানের মধ্যে হজ হচ্ছে অন্যতম একটি ফরজ বিধান। যা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য যথাসময়ে সঠিক নিয়মে আদায় করা ফরজ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ করা ফরজ। বিশেষত যারা সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে।
আর তা যদি কোনো কারণে, ইচ্ছা-অনিচ্ছায়, যেকোনো উদ্দেশ্যে কেউ প্রত্যাখ্যান করে, তবে সে জেনে রাখুক! আল্লাহ তায়ালা বিশ্বজগতের প্রতি মুখাপেক্ষীহীন’ (সুরা আলে ইমরান : ৯৭)। আর পুণ্যময় হজব্রত পালন করা উচিত একমাত্র মহান আল্লাহ তায়ালার বিধান পালনার্থে, শুধু তাঁরই আনুগত্যের লক্ষ্যে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা হজ ও ওমরাহ পূর্ণ করো আল্লাহর জন্য।’ (সুরা বাকারা : ১৯৬)
আরও পড়ুন
মহান আল্লাহ তায়ালার রাজি ও সন্তুষ্টি অর্জনই একমাত্র হজ পালনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। এ ছাড়া যেকোনো ধরনের লোক দেখানো, লোকে হাজি সাহেব বলে সম্বোধন করবে, নামের সঙ্গে হাজি সাহেব লেখা হবে এ জাতীয় কোনো উদ্দেশ্যে হজ আদায় করা উচিত নয়। এ জন্য যারা হজের নিয়ত করব, হজ পালনের ইচ্ছে আছে, এখন থেকেই আমাদের নিয়তকে পরিশুদ্ধ করা জরুরি। অনেকে আমরা হজের নিয়তও করতে চাই না। সাধ্য-সামর্থ্য ও তওফিক আল্লাহই দান করবেন। কিন্তু নিয়ত তো করতে হবে আমাদের। আর এ কথা স্মরণ রাখা জরুরি যে, বান্দার যাবতীয় নেক আমলের উপযুক্ত বিনিময় আল্লাহ তায়ালাই দান করবেন। কতগুলো আমলের প্রতিদান তিনি নিজেই দান করবেন। তবে আমাদের নিয়ত ও উদ্দেশ্য বিশুদ্ধ হওয়া জরুরি। সাহাবি হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয়ই আমল বা কাজগুলোর প্রাপ্য বা সঠিক প্রতিদান দেওয়া হবে প্রত্যেক মানুষের নিজ নিজ নিয়ত অনুযায়ী। আর মানুষ তাদের প্রত্যেকের আমলের বিনিময় নিয়ত অনুযায়ীই পাবে (সহিহ বুখারি)। এ জন্য আমাদের করণীয় হলো, আমরা প্রত্যেকেই হজ পালনের জন্য বিশুদ্ধ নিয়ত করব। আল্লাহ তায়ালা যেন আমাদের হজ আদায় করার তওফিক দান করেন। এ জন্য আমরা নিয়মিত দোয়া করব। তবেই অবশ্য আল্লাহ তায়ালা এ আমলটিকে সহজ করবেন। এমনকি আর্থিক অসংগতি সত্ত্বেও কোনো না কোনো মাধ্যমে হজের নিয়তকে পূরণ করার তওফিক দান করবেন।
এমনও হতে পারে আমাদের কাছে পর্যাপ্ত অর্থসম্পদ নেই। হজ করা ফরজও নয়! কিন্তু আল্লাহর ঘর জিয়ারত করা, নবীজি (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারতের বাসনা এবং আশা ও স্বপ্ন আছে। তবে নিয়ত করতে তো আর কোনো অসুবিধা নেই। আপনি নিয়ত করুন। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা নিয়তের উত্তম বিনিময় আপনাকে দেবেন। এমনও হতে পারে আপনার বদলে আপনারই অন্য কোনো নিকটাত্মীয় ছেলেমেয়ে বা নাতি, কিংবা ভাইবোন কেউ না কেউ আপনার পরিবর্তে হজ আদায় করবেন। যাকে বলা হয় বদলি হজ। হাদিসে এমন একটি বর্ণনা এসেছে।
যেখানে একজনের হজ অন্য কেউ তার অক্ষমতা বা অপারগতায় আদায় করা যায় মর্মে স্পষ্ট বর্ণনা উল্লেখ আছে। বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার খাশআম গোত্রের এক মহিলা নবীজি (সা.)-এর সামনে উপস্থিত হলেন। মহিলাটি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর বান্দার ওপর ফরজকৃত হজ আমার বৃদ্ধ পিতার ওপর ফরজ হয়েছে। কিন্তু তিনি বাহনের ওপর স্থির থাকতে পারেন না, আমি কি তাঁর পক্ষ হতে হজ আদায় করব? তিনি বললেন হ্যাঁ (আদায় করো)। এ ঘটনাটি ছিল বিদায় হজের সময়ের। (সহিহ বুখারি)
হজ ইসলামের সর্বোত্তম আমলগুলোর মধ্যে মহান আল্লাহর অন্যতম পছন্দনীয় একটি আমল। আবার হজের বিনিময়ে রয়েছে গুনাহ মুক্তি ও নিষ্পাপ জীবন লাভের ঘোষণা। হাদিসে এসেছে, প্রসিদ্ধ সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.)-কে জিগ্যেস করা হলো, সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনা (অর্থাৎ বিশ্বাস স্থাপন করা)। জিগ্যেস করা হলো, অতঃপর কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা। জিগ্যেস করা হলো, অতঃপর কোনটি? তিনি বলেন, হজে মাবরুর তথা মাকবুল হজ (সহিহ বুখারি)। তাই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আমলের প্রতি আমাদের কারও অবহেলা করা উচিত নয়।
এ জন্য আমাদের যাদের সামর্থ্য আছে তারা তো জীবনে একবার হলেও হজ করবই; যাদের অর্থসম্পদ ও সামর্থ্য নেই কিন্তু পুণ্যভূমি মক্কা-মদিনা জিয়ারত করার ইচ্ছা আছে- আসুন, আমরা এখনই পবিত্র হজ পালনের নিয়ত করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের হজের জন্য কবুল করুন। বায়তুল্লার জিয়ারতে ধন্য করুন। নিষ্পাপ নবজাতকের মতো গুনাহমুক্ত জীবনযাপন করার তওফিক দান করুন।
খতিব, ভবানীপুর মাইজপাড়া হক্কানি, জামে মসজিদ, গাজীপুর
এএডি/