চট্টগ্রাম নগরজুড়ে বেড়েই চলেছে বেওয়ারিশ কুকুর। মূল সড়ক ও অলিগলিপথে ঘুরছে। গুরুত্বপূর্ণ ঘন বসতির ওয়ার্ডগুলোতে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা অনেক বেশি। প্রায় প্রতিদিন এসব কুকুরের কামড়ে আহত হওয়ার তথ্য মিলছে।
নগরী ও নগরীর বাইরে গড়ে অন্তত ৫০০ জন জলাতঙ্কের টিকা নেন। মাঝেমধ্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)।
তবে এখনও শতভাগ কুকুর টিকার আওতায় আনা যায়নি। চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে বেওয়ারিশ কুকুরের তথ্য নেই। টিকার আওতার বাইরে কত বেওয়ারিশ কুকুর আছে তার কোনো পরিসংখ্যানও নেই।
জলাতঙ্কের টিকা গ্রহণ বাড়ছে বলে জানান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিকেল ইনফেকশাস ডিজিজেসের (বিআইটিআইডি) পরিচালক ডা. ইফতেখার আহম্মদ।
তিনি সময়ের আলোকে বলেন, সীতাকুণ্ডের এই হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন ২০০ জনকে জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়। মাসে ছয় হাজার লোককে টিকা দেওয়া হয়। বছরে ৭২ হাজার টিকা দেওয়া হয় এই হাসপাতালে। এই পরিসংখ্যান বলে জলাতঙ্কে আতঙ্ক বা আক্রান্ত বাড়ছে। এটা ছাড়া নির্ধারিত সরকারি হাসপাতালেও দেওয়া হয় জলাতঙ্কের টিকা।
বেশিরভাগই বিড়ালের আঁচড়ে আহত লোকজন। এর মধ্যে কুকুরের কামড় বা আঁচড়ে আহতরাও আছেন। অথচ পোষা কুকুর-বিড়ালকে টিকা দেওয়া হলে জলাতঙ্কের আতঙ্ক অনেক কমে যেত। গণহারে টিকা দেওয়ার প্রয়োজন হতো না।
চসিক গত জানুয়ারিতে ১৪ হাজারের বেশি কুকুরকে টিকা দিয়েছে। এটা বেওয়ারিশ কুকুরের তুলনায় পর্যাপ্ত কি না এ প্রশ্নে তিনি বলেন, প্রতিটি কুকুরকেই টিকা দিতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী এটা করা দরকার। তবেই জলাতঙ্কের আতঙ্ক থেকে মুক্তি মিলবে। চসিকের এই টিকা কার্যক্রম পর্যাপ্ত বলে আমার মনে হচ্ছে না।
চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীকে জলাতঙ্কমুক্ত করতে চসিকের তত্ত্বাবধানে ১৫ হাজার বেওয়ারিশ কুকুরের টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়। নগরীর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সামনে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
উদ্বোধনের পর থেকে কিছু দিন ধারাবাহিক টিকা দেওয়া হয়। নগরীর ৪১ ওয়ার্ডে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিশেষ কৌশলে আটকে টিকা দেওয়া হয় বেওয়ারিশ কুকুরকে। চসিকের মতে ১৫ হাজার কুকুরকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ইতিমধ্যে ১৪ হাজার কুকুরকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতে টিকা কার্যক্রম আবার শুরু করা হবে। তবে নগরবাসীর অভিযোগ বেওয়ারিশ কুকুরের তুলনায় টিকা দেওয়া হয়েছে খুবই অল্প। অলিগলিতে হাজারও বেওয়ারিশ কুকুর টিকার বাইরে থেকে গেছে। এতে জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কোনোভাবে কমেনি।
এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ইমাম হোসেন রানা সময়ের আলোকে বলেন, গত জানুয়ারিতে আমরা ১৪ হাজার বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দিয়েছিলাম।
২০২৩ সালেও একবার টিকা দেওয়া হয়। আমাদের টার্গেট আছে ৭০ শতাংশ বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দেওয়া। বাকি ৩০ শতাংশ কুকুর স্বয়ংক্রিয়ভাবে জীবানুরোধী হয়ে যাবে।
নগরীর অলিগলিতে শত শত বেওয়ারিশ কুকুর ঘুরে বেড়ায়। ৬০ বর্গমাইলের নগরীতে মাত্র ১৪ হাজার কুকুরকে টিকা দেওয়া পর্যাপ্ত কি না এ প্রশ্নে তিনি বলেন, আসলে জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধে প্রতি ছয় মাস পরপর ভ্যাকসিন দেওয়া উচিত। তাতে বেওয়ারিশ কুকুর থেকে জলাতঙ্কের আতঙ্ক দূর হবে। নগরীতে যা বেওয়ারিশ কুকুর আছে সেই তুলনায় ভ্যাকনিসেন প্রোগ্রাম পর্যাপ্ত বলা যাবে না।
প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা দাবি করেন, কোনো একটি এলাকায় যদি অন্তত ৭০ শতাংশ কুকুর টিকার আওতায় আসে তবে সেখানে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হয়। এতে জলাতঙ্ক ভাইরাসের বিস্তার কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের কাছে পরিসংখ্যান না থাকলেও ৭০ শতাংশ টিকার আওতায় এসেছে বলে মনে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম সময়ের আলোকে বলেন, বেওয়ারিশ বা ওয়ারিশ কুকুরকে যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করে টিকা দিতে হয়। জলাতঙ্কের টিকা দেওয়ার পর ঝুঁকি এড়াতে বুস্টার ডোজও দিতে হয়।
সিটি করপোরেশন ১৪ হাজারের বেশি বেওয়ারিশ কুকুরকে টিকা দিলেও পর্যাপ্ত নয়। এসব কুকুরকে বুস্টার ডোজ দেওয়া হয়েছে কি না জানা নেই। জলাতঙ্কের ঝুঁকি এড়াতে আরও বেশি টিকা কার্যক্রম চালানো দরকার।
গত জানুয়ারিতে মেয়র শাহাদাত হোসেন টিকা কার্যক্রম চলাকালে বলেছিলেন, নগরীতে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা
বেড়েছে। কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্ক রোগ নিয়ে জনসাধারণের উদ্বেগ রয়েছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সমাধান করতে কুকুর নিধনের পথ পরিহার করে টিকাদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকরা জানান, জলাতঙ্ক অত্যন্ত প্রাণঘাতী ভাইরাসজনিত রোগ। জলাতঙ্ক আক্রান্ত কুকুরের কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হয়।
তবে সব কুকুরের কামড়েই জলাতঙ্ক হয় না। ভাইরাস বহনকারী কুকুরের ক্ষেত্রেই ঝুঁকি থাকে। জলাতঙ্ক আক্রান্ত কুকুরের সম্ভাব্য কিছু লক্ষণ থাকে।
এর মধ্যে আছে অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, লক্ষ্যহীন দৌড়াদৌড়ি, সবকিছু কামড়ানোর প্রবণতা ও চলাফেরায় অসুবিধা। এ ধরনের লক্ষণ দেখা গেলে সাধারণ মানুষকে ওই কুকুরের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে।
তাৎক্ষণিক সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে যোগাযোগ করা জরুরি। জলাতঙ্ক শতভাগ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে পোষা কুকুর ও বিড়ালকে নিরাপদ রাখা যায়।
জলাতঙ্ক সন্দেহে লঙ্কাকাণ্ড, ভিডিও ভাইরাল : বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে নগরজুড়ে লোকজনের মধ্যে সবসময় আতঙ্ক থাকে। কেউ অস্বাভাবিক আচরণ করলে অনেকে মনে করেন জলাতঙ্ক রোগী।
গত ৯ মে বিকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিপরীতে এপিক হেলথের সামনে এক কিশোরকে নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড ঘটে গেছে। সেখানে ওষুধের দোকানের করিডোরে এক শিশুকে দেখা যায় উদ্ভট আচরণ করতে। উৎসুক লোকজন জড়ো হয়ে দেখেছে সেই শিশুকে। শিশুটি মাঝেমধ্যে উঁচুস্বরে কেঁদে উঠছে। কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করছিল।
সবার ধারণা ছিল সেই শিশুটি জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত। আঁচড় থেকে বাঁচতে বেশিরভাগ লোকজন দূরে দাঁড়িয়ে শিশুটির অস্থির অবস্থা দেখছিলেন। শিশুটির ঘেউ ঘেউ করার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। মুহূর্তে ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়।
ভিডিও দেখে অনেকেই মনে করেন বেওয়ারিশ কুকুরের কামড় আঁচড়ে ছড়িয়ে পড়েছে জলাতঙ্ক রোগ। যেখানে সেখানে জলাঙ্ক রোগীর দেখা মিলছে। পরে সেই কিশোরকে উদ্ধার করে প্রথমে সীতাকুণ্ডে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিকেল ইনফেকশাস ডিজিজেস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
রোববার পরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানিয়ে দেন তার কোনো জলাতঙ্ক নেই। আবদুল্লাহ নামে ১২/১৩ বছরের ঠিকানাহীন ওই পথশিশুকে রোববার রাতে নিয়ে আসা হয় নগরীর আন্দরকিল্লা এলাকার জেনারেল হাসপাতালে।
সেখান থেকে সোমবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকরা ধারণা করছেন তার মানসিক সমস্যা আছে। সেজন্য শিশুটি কুকুরের মতো মাঝেমধ্যে ঘেউ ঘেউ করে।
/এসএকে