ঝালকাঠিতে দেশি গরু পালনেই এখন বেশি আগ্রহী স্থানীয় খামারিরা। দেশি গরু পালন করে লাভবানও হচ্ছেন তারা। চাকরির পেছনে না ছুটে কিংবা বিদেশের মোহ ত্যাগ করে জেলার বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত যুবক এখন নিজ মাটিতেই খুঁজে পেয়েছেন সমৃদ্ধির পথ।
দেশীয় পদ্ধতিতে গরু হৃষ্টপুষ্ট করে তারা যেমন স্বাবলম্বী হচ্ছেন তেমনই জেলার মাংসের চাহিদাও পূরণ করছেন। সফল খামারির খাতায় নাম লিখিয়েছেন নারীরাও।
তেমনই একজন ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সফল নারী উদ্যোক্তা ফারিয়া আক্তার ইলা। কটূক্তিতে না থেমে আজ তিনি সফল নারী খামারি। সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে লালন-পালনের মধ্য দিয়ে তিনি প্রস্তুত করেছেন কুরবানির পশু।
জেলা যুব উন্নয়ন অধিদফতরের উপপরিচালক মো. আলাউদ্দিন বলেন, ঝালকাঠির যুবকরা এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা বিদেশ যেতে দালালের হাতে টাকা নষ্ট না করে প্রশিক্ষণ নিয়ে গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
আমরা তাদের ঋণ ও সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দিয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছি যা জেলার সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পশুর নিশ্চয়তা দিয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নীরোদ বরণ জয়ধর বলেন, ঝালকাঠিতে দেশি গরু পালনে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। খামারিরা এখন সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও প্রাকৃতিক উপায়ে পশু হৃষ্টপুষ্ট করছেন।
আমাদের তালিকায় থাকা ১ হাজার ৫৩৫টি খামার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কুরবানি উপলক্ষে প্রতিটি পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং হাটে অসুস্থ পশু শনাক্ত করতে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম মাঠে সক্রিয় থাকবে।
জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন বলেন, প্রাণীকে রোগমুক্ত বা সুস্থ-সবল করতে পারলে দুধ, মাংস, ডিমের মাধ্যমে জিডিপি অর্জন করা সম্ভব।
এতে দেশ ও খামারিরা সচ্ছল এবং স্বাবলম্বী হতে পারবেন। বর্তমানে দক্ষ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে। সবাইকে সচেতন থাকার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় এ বছর কুরবানির পশুর চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ হাজার ২৩৪টি। বিপরীতে জেলার খামারিদের কাছে কুরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত আছে ৩০ হাজার ৫৮৮টি। অর্থাৎ চাহিদার চেয়েও ৩৫৪টি পশু বেশি আছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জেলায় মোট খামারের সংখ্যা ১ হাজার ৫৩৫টি। এর মধ্যে ১৬৩টি নিবন্ধিত এবং ১ হাজার ৩৭২টি অনিবন্ধিত খামার থাকলেও সবখানেই এখন চলছে শেষ মুহূর্তের চূড়ান্ত ব্যস্ততা।
জেলায় প্রস্তুত থাকা ৩০ হাজার ৫৮৮টি পশুর মধ্যে ৯ হাজার ৮০৮টি ষাঁড়, ৮ হাজার ৮৭০টি বলদ, ১ হাজার ৭৭৪টি গাভি, ১৩৯টি মহিষ, ৯ হাজার ৯৬৫টি ছাগল এবং ৩২টি ভেড়া আছে। স্থানীয় খামারিদের দাবি, ভারতীয় গরু অবৈধ পথে আসা বন্ধ থাকলে তারা তাদের কষ্টের সঠিক মূল্যায়ন পাবেন এবং আগামীতে খামারের সংখ্যা আরও বাড়বে।
ঝালকাঠি সদর উপজেলার গাবখান বাজারের রেজাউল করীম ছোটবেলা থেকেই কাজ করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। এই উদ্যোক্তা প্রথমে দুধের চাহিদা মেটাতে দুটি গাভি পালন শুরু করেন। বর্তমানে তার খামারে ৪৫টি গরু।
১৫টি গাভি থেকে প্রতিদিন শতাধিক লিটার দুধ পান। প্রতি লিটার বিক্রি হয় ৭০ টাকা দরে। পরিচর্যার জন্য আছেন ৩ জন শ্রমিক। ২৬টি বলদ তৈরি করা হয়েছে কুরবানিতে বিক্রির জন্য।
সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের চিকিৎসক মিজানুর রহমান বলেন, ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের গাবখান বাজারের রেজাউল করীম গাভির খামার করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তিনি খামারিদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। আমাদের সাধ্য অনুযায়ী যাবতীয় পরামর্শ প্রদানসহ সার্বিক সহযোগিতা করছি তাকে।
রেজাউল করীম জানান, ছোটবেলা থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন তিনি। অবসরপ্রাপ্ত বাবার কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ইটভাটার অংশীদার হন। ইটভাটায় সাতক্ষীরার শ্রমিকরা কাজ করতেন।
পারিবারিক দুধের চাহিদা মেটাতে শ্রমিকদের সাহায্যে সাতক্ষীরা থেকে দুটি গাভি আনেন। এরপর আগ্রহ বাড়ে গাভি পালনের। ইটভাটার অংশীদারত্ব ছেড়ে আরও চারটি গাভি কিনে শুরু করেন খামার। স্থান সংকুলান না হওয়ায় নতুন শেড নির্মাণ করেন। সেখানে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪৫টি গরু আছে। সবই দেশি ফ্রিজিয়ান ও জার্সি জাতের।
খামারে উৎপাদিত দুধ দিয়ে মিষ্টিজাত পণ্য তৈরি করতে ডাক্তারপট্টিতে দোকান দেন। বাইরের দোকানেও দুধ বিক্রি করেন। আসন্ন ঈদুল আজহায় বিক্রির জন্য ২৬টি গরু প্রস্তুত করেছেন তিনি। দেশীয় পদ্ধতিতে খৈল, ভুসি, ভাতের মাড়, খড়কুটো ও চাষকৃত ঘাস খাওয়ান তিনি।
রেজাউল জানান, গরুর মল-মূত্র মোটরের পানি দিয়ে পরিষ্কার করে একটি ট্যাঙ্কিতে রাখেন। সেটির মাধ্যমে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট করে পাইপের মাধ্যমে গ্যাস নিয়ে পারিবারিক কাজে ব্যবহার করেন। গো-খাদ্য জোগানোর জন্য সাড়ে পাঁচ বিঘা জমিতে ঘাস চাষ করেন তিনি।
আমন ধান ঘরে উঠলে পর্যাপ্ত খড়-কুটো কিনে রাখেন। খামারের পরিচর্যার জন্য তিনজন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন যাদের প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতন দিতে হয়। গত কুরবানিসহ বিভিন্ন সময়ে ১৪ লাখ টাকারও বেশি দামে ১০টি গরু বিক্রি করেছেন।
ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার নারী উদ্যোক্তা ফারিয়া আক্তার ইলা এখন এলাকায় সফল খামারি হিসেবে পরিচিত। ২০২২ সালে মাত্র একটি গরু পালন দিয়ে যাত্রা শুরু, বর্তমানে তার রয়েছে ৬০টিরও বেশি গরু। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে তার ফাহিয়ান অ্যাগ্রো ফার্মে সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে লালন-পালনের মধ্য দিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে কুরবানির পশু।
ছোট পরিসরে গরু পালন শুরু করার পর ধীরে ধীরে খামার গড়ার স্বপ্ন দেখেন ফারিয়া আক্তার ইলা। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিরলস পরিশ্রম ও পরিবারের সহযোগিতায় গড়ে তোলেন ফাহিয়ান অ্যাগ্রো ফার্ম। বর্তমানে তার খামারে শাহিওয়াল, ফাইটার, ওয়েস্টার্ন ফ্রিজিয়ানসহ বিভিন্ন জাতের গরু রয়েছে।
খড়কুটো, ঘাস ও দানাদার খাবার খাইয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে গরুগুলো মোটাতাজা করা হচ্ছে। গরুর খামারের পাশাপাশি তিনি ছাগল পালন, কবুতর পালন এবং মাছ চাষও করছেন। এতে তার খামারটি একটি বহুমুখী কৃষি উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
রাজাপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ফারিয়া আক্তার ইলা একজন নারী উদ্যোক্তা। তিনি কুরবানির জন্য দেশীয় পদ্ধতিতে তার খামারে গরু লালন-পালন করে মোটাতাজা করেছেন। আমরা তাকে সবসময় পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে আসছি।
ফারিয়া আক্তার ইলা বলেন, শুরুতে অনেকেই আমাকে নিয়ে কটূক্তি করেছে। একজন নারী হয়ে খামার পরিচালনা করা নিয়ে নানা ধরনের বাজে মন্তব্য শুনতে হয়েছে।
কিন্তু আমি থেমে যাইনি। নিজের স্বপ্ন পূরণে কাজ করে গেছি। এখন মানুষ প্রশংসা করছে, এটিই সবচেয়ে বড় পাওয়া। খামারের পশুগুলো সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে লালন-পালন করা হচ্ছে। কোনো ক্ষতিকর উপায়ে মোটাতাজাকরণ করা হয় না। ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
এই সফলতার পেছনে স্বামী সুমন খানের অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে ফারিয়া জানান, শুরু থেকেই তার স্বামী সাহস ও সহযোগিতা দিয়ে পাশে ছিলেন। ফলে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পেয়েছেন।
বর্তমানে ফাহিয়ান অ্যাগ্রো ফার্মে এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। খামারে কাজ করে তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
স্থানীয়রা জানান, একসময় যারা ফারিয়া আক্তার ইলাকে নিয়ে সমালোচনা করতেন, এখন তারাই তার সফলতায় প্রশংসা করছেন। নারী হিসেবে তার এই উদ্যোগ এলাকায় অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। স্বপ্ন, সাহস ও পরিশ্রমের সমন্বয়ে একজন নারী উদ্যোক্তার সফল হয়ে ওঠার অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছেন রাজাপুরের ফারিয়া আক্তার ইলা।
/এসএকে